-1778411894700-611310666.webp&w=1920&q=75)
ছোটবেলায় রাত গভীর হলে, জ্বরে গা পুড়ে গেলে, স্বপ্নের ভেতর ভয় পেয়ে উঠলে একটাই ডাক মুখ থেকে বেরিয়ে আসত; ‘মা’। শুধু দুটি অক্ষরের একটি ডাক; কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ। সেই ডাক শুনেই যিনি অন্ধকারে ছুটে আসতেন, যার হাতের ছোঁয়ায় জ্বর কমে যেত, ভয় সরে যেত, ব্যথা মিলিয়ে যেত, তিনি মা।
আজ বিশ্ব মা দিবসে যখন কোটি কোটি মানুষ তাদের মাকে ভালোবাসা জানাচ্ছেন, তখন মনে পড়ছে সেই সব মায়েদের কথা, যারা সারাটি জীবন দিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু বিনিময়ে চাননি কিছুই।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত একটি গ্রামের কথা ভাবুন। নাম সুফিয়া বেগম। বয়স পঁচাত্তর ছুঁই ছুঁই। চোখে আর আগের মতো দেখেন না। হাঁটু দুটো বেঁকে গেছে বয়সের ভারে। তবু প্রতিদিন ভোরবেলা উঠে উঠানে বসে থাকেন। পথের দিকে চেয়ে থাকেন। ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে, মেয়ে ঢাকায়। মাসে একবার ফোন আসে। কখনো কখনো সেটুকুও আসে না। পাশের বাড়ির বউ এসে জিজ্ঞেস করে, ‘মা, কী দেখেন?’ সুফিয়া বেগম হাসেন। বলেন, ‘কিছু না, মা। বাতাস দেখি।’ কিন্তু আসলে তিনি দেখেন বাড়ির পথটুকু। সেই পথে কেউ আসবে এই আশায় বুকের ভেতর একটা আলো জ্বালিয়ে রাখেন। প্রতিদিন। প্রতিটি ভোরে।
এই সুফিয়া বেগম কিন্তু কাল্পনিক নন। তিনি বাংলাদেশের লাখো মায়ের প্রতিনিধি। যারা নিজের খাবার কমিয়ে সন্তানের পেট ভরিয়েছেন। যারা শীতের রাতে পাতলা কাঁথা গায়ে দিয়েছেন ভালো কম্বলটা সন্তানের গায়ে চড়িয়ে। যারা নিজের স্বপ্নকে কবর দিয়েছেন সন্তানের স্বপ্নের জন্য। ফকির আলমগীরের সেই বিখ্যাত গানে যে সত্য আছে, ‘মায়ের একধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম, পাপোষ বানাইলেও ঋণের শোধ হবে না’। শব্দগুলো শুধু গানের কথা নয়, এ আমাদের জাতীয় সত্য, আমাদের সামাজিক বাস্তবতা।
বলিউডের সেই অমর গান, ‘মা ও মেরি মা, মে তেরা লাডলা’; প্রতিটি মানুষের অন্তরে যে আকুলতা আছে মায়ের জন্য, তাকেই ভাষা দিয়েছে। সীমান্তের ওপারে হিন্দিতে হোক, আর এপারে বাংলায় হোক, মায়ের জন্য সন্তানের কান্না একই ভাষায় কাঁদে। কারণ, মাতৃপ্রেম কোনো ভৌগোলিক সীমা মানে না, কোনো ভাষার বাধা মানে না। এটি মানবজাতির সবচেয়ে আদিম ও সবচেয়ে পবিত্র অনুভূতি।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুর মানসিক বিকাশের ভিত্তি তৈরি হয় মায়ের সঙ্গে প্রথম সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু মনোবিজ্ঞানী ড. জন বোলবির সংযুক্তি তত্ত্ব বলে, মা ও শিশুর মধ্যে যে আবেগীয় বন্ধন, তা শিশুর সারাজীবনের মানসিক স্বাস্থ্য নির্ধারণ করে। যে শিশু মায়ের উষ্ণতায় বড় হয়, সে বড় হয়ে মানুষকে ভালোবাসতে পারে, বিশ্বাস করতে পারে, সম্পর্ক গড়তে পারে। আর মায়ের ভালোবাসাবঞ্চিত শিশু সারাজীবন ধরে একটা শূন্যতা বহন করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ২৮ কোটি ৫০ লাখ নারী গর্ভধারণ করেন। প্রতিটি মা এই যাত্রায় তার শরীর ও মনকে সীমাহীন কষ্টে রাখেন। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ মা প্রসবজনিত কারণে মারা যান; তাদের অধিকাংশই উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র নারী। ইউএন উইমেনের গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মা তার জীবনের গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ বছর সন্তানের জন্য অবৈতনিক পরিচর্যার কাজ করেন। যার বাজারমূল্য নির্ধারণ করলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বার্ষিক যোগ হবে ১০.৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
কিন্তু আজকের আধুনিক সমাজ কি এই ঋণের কথা মনে রাখছে? বাংলাদেশে গত এক দশকে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় অনেক মা-বাবা এখন একা থাকেন। সন্তানরা বিদেশে বা শহরে ব্যস্ত জীবনযাপনে। বছরে একবার ঈদে আসেন, কিছু টাকা পাঠান, ভাবেন দায়িত্ব পালন হয়ে গেছে। কিন্তু সুফিয়া বেগমের মতো মায়েরা টাকা চান না। তারা চান একটু সময়। একটু কথা। একটু হাতের ওপর হাত।
সমাজবিজ্ঞানীরা এই বিচ্ছিন্নতাকে বলছেন ‘কেয়ার ডেফিসিট’ অর্থাৎ যত্নের ঘাটতি। জার্মানির সমাজবিজ্ঞানী অ্যাক্সেল হনেথ বলেন, আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ মানুষকে উৎপাদনশীলতার মানদণ্ডে বিচার করতে শেখায়। বৃদ্ধ মা-বাবা যখন ‘অনুৎপাদনশীল’ হয়ে পড়েন, তখন তারা পরিবারের কেন্দ্র থেকে প্রান্তে সরে যান। এই মানসিকতাই পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে আমরা সারাদিন ফোনের পর্দায় তাকিয়ে থাকি, কিন্তু কতদিন মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েছি? কতদিন জিজ্ঞেস করেছি, ‘মা, তুমি কেমন আছো?’
প্রবাসী সন্তানের বিষয়টা আলাদাভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের লক্ষাধিক পরিবারে আজ এই চিত্র, ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে, মেয়ে মালয়েশিয়ায়, আর মা গ্রামে একা। রেমিট্যান্সের টাকায় পাকা বাড়ি উঠেছে, রঙিন টেলিভিশন আছে, কিন্তু ঘরে মানুষ নেই। মা রাতে টেলিভিশনের নীল আলোয় বসে থাকেন। মোবাইল ফোনে ছেলের ছবি দেখেন। ভিডিও কলে কয়েক মিনিট কথা বলেন। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ফোনের পর্দায় আঙুল বোলান যেন ছোঁয়া পাচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৬০ বছরের বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ। এদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একা বা অবহেলায় জীবনযাপন করছেন। জেলা সমাজসেবা অফিসের তথ্য বলছে, বৃদ্ধাশ্রমে আগত ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশেরই সন্তান আছে, তবু তারা এখানে।
চল্লিশ বছর আগের কথা। রাজশাহীর এক প্রত্যন্ত গ্রামে বাবা মারা গেলেন যখন, তখন রহিমার বড় ছেলে মিলন মাত্র বারো বছর। ছোট দুই ভাই-বোন। রহিমা একা। চাষের জমি নেই, অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। মিলনকে পড়াশোনা ছাড়তে হবে, এমন কথা গ্রামের মানুষ বলল। রহিমা বলল না। নিজে উপোষ থেকে ছেলেকে পড়িয়েছেন। ভোরবেলা অন্যের ঘরে কাজ করেছেন, বিকেলে মাঠে, রাতে সেলাই করেছেন। মিলন একদিন বিশ্ববিদ্যালয় পাস করল, চাকরি পেল, বিয়ে করল, ঢাকায় ফ্ল্যাট কিনল। রহিমাকে একবার নিয়ে গেল শহরে। কিন্তু রহিমার মন পড়ে রইল গ্রামে। ছেলের ব্যস্ত সংসারে নিজেকে অতিরিক্ত মনে হলো। ফিরে এলেন গ্রামে। একা।
মিলন ঠিকই মাসে মাসে টাকা পাঠায়। কিন্তু যেদিন রাত তিনটায় রহিমার বুকে ব্যথা উঠল, সেদিন পাশে ছিল শুধু প্রতিবেশী বুড়ি। হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল সেই বুড়িই। মিলন খবর পেয়ে পরের দিন সকালে এলো। মায়ের হাত ধরে কাঁদল। মা বললেন, ‘কাঁদিস না বাবা। তুই ভালো থাকলেই মা ভালো থাকে।’ এই একটি বাক্যে সমস্ত মায়ের জীবনদর্শন। নিজের কষ্ট গোপন করে সন্তানের সুখে আনন্দিত হওয়ার এই অপার ক্ষমতা, এটাই মাতৃত্বের সংজ্ঞা।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একাকীত্ব আজকের বিশ্বে একটি মহামারির রূপ নিয়েছে। ব্রিটিশ চিকিৎসক ড. ফে ক্রক্সটনের গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদী একাকীত্ব মানুষের আয়ু গড়ে ১৫ বছর কমিয়ে দেয়। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষণায় বলা হয়েছে, সন্তানের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন বৃদ্ধ মায়েদের মধ্যে বিষণ্নতার হার ৬৮ শতাংশ বেশি। আমরা মাকে বাঁচিয়ে রাখছি টাকা দিয়ে, কিন্তু মেরে ফেলছি অবহেলায়।
আমরা কোথায় যাচ্ছি? কোন সভ্যতার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে ‘ব্যবস্থা করে দিলাম’ ভেবে স্বস্তি পাচ্ছি? অথচ সেই মা, যিনি আমাদের প্রথম কদম মাটিতে পড়তে শেখালেন, প্রথম মা বলে ডাকতে শেখালেন, প্রথম ‘আমি পারব’ বলার সাহস দিলেন, তিনি আজ একটা ঘরের কোণে চুপ করে বসে আছেন, চোখে জল নেই, কারণ কাঁদতে কাঁদতে আর জল নেই।
একটি কথা মনে পড়ে। মিলনের মা যখন শেষবার হাসপাতালে ভর্তি হলেন, তখন ডাক্তার বললেন, ‘এখন একটু ভালো আছেন, তবে একা রাখবেন না।’ মিলন বাড়ি ফিরে অফিসের ফাইল খুলল। ভাবল, কাল থেকে দেখা যাবে। সেই রাতেই মা চলে গেলেন। শেষবার শুধু বলেছিলেন, ‘মিলন এলে বলো, আমি একটু ঘুমাচ্ছি।’ কিন্তু সে ঘুম আর ভাঙল না। মিলন সেই থেকে প্রতি রাতে ঘুমাতে পারে না। বুকের মধ্যে একটা প্রশ্ন জেগে থাকে: ‘কেন গেলাম না?’
এই ‘কেন গেলাম না’ এই অনুশোচনার আগুন নিভবে না কোনোদিন। তাই আজ, এই মুহূর্তে, এই বিশ্ব মা দিবসে যার মা বেঁচে আছেন, তিনি যেন একবার ফোন রাখুন, ট্যাবলেট বন্ধ করুন, এবং মায়ের পাশে গিয়ে বসুন। শুধু বলুন, ‘মা, তুমি কেমন আছো?’ এটুকুই যথেষ্ট। মায়ের চোখে যে আলো জ্বলে উঠবে, সেই আলো কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র জ্বালাতে পারবে না।
মনোবিজ্ঞানী ড. ব্রেনে ব্রাউন বলেন, ‘সংযোগ মানুষের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদা। কোনো অর্থ বা বস্তু এই সংযোগের বিকল্প হতে পারে না।’ আজকের প্রযুক্তির যুগে আমরা ভার্চুয়ালি সংযুক্ত, কিন্তু বাস্তবে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন। মায়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হয় হৃদয় দিয়ে, ফাইবার অপটিক কেবল দিয়ে নয়।
মা হচ্ছেন সেই মহাসমুদ্র যেখান থেকে আমরা সবাই জন্ম নিয়েছি। সমুদ্রকে কি আমরা ভুলে যেতে পারি? পারি না। তবু ভুলি। আজকের এই বিশেষ দিনে শুধু একটাই আবেদন, মাকে শুধু মা দিবসে ফুল দেবেন না। তাকে প্রতিদিন ভালোবাসুন। প্রতিদিন যোগাযোগ রাখুন। বৃদ্ধাশ্রম নয়, তাকে ঘরে রাখুন। তার কথা শুনুন। সেই পুরোনো গল্পগুলো যা আপনার কাছে পুনরাবৃত্তি মনে হয়, কিন্তু মায়ের কাছে প্রতিটি গল্পই নতুন, কারণ সেই গল্পে তিনি আপনাকে খুঁজে পান। মায়ের সঙ্গে একটা পারিবারিক সংস্কৃতি গড়ে তুলুন যেখানে বয়স্কদের সম্মান করা হয়, যেখানে মা-বাবাকে বোঝা মনে করা হয় না।
মনে রাখবেন, আমরাও একদিন বৃদ্ধ হব। আমাদের সন্তানরাও একদিন ব্যস্ত হয়ে যাবে। আমরা যেভাবে মাকে রাখব, সন্তানেরা আমাদের সেইভাবেই রাখবে। মানবিক মূল্যবোধের এই শিক্ষাটি ঘরেই শুরু হয়, মায়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের মধ্য দিয়েই। তাই মাকে ভালোবাসা শুধু ব্যক্তিগত কর্তব্য নয়, এটি সামাজিক দায়িত্ব, এটি সভ্যতার মানদণ্ড।
-1778411894700-611310666.webp&w=1920&q=75)
ছোটবেলায় রাত গভীর হলে, জ্বরে গা পুড়ে গেলে, স্বপ্নের ভেতর ভয় পেয়ে উঠলে একটাই ডাক মুখ থেকে বেরিয়ে আসত; ‘মা’। শুধু দুটি অক্ষরের একটি ডাক; কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ। সেই ডাক শুনেই যিনি অন্ধকারে ছুটে আসতেন, যার হাতের ছোঁয়ায় জ্বর কমে যেত, ভয় সরে যেত, ব্যথা মিলিয়ে যেত, তিনি মা।
আজ বিশ্ব মা দিবসে যখন কোটি কোটি মানুষ তাদের মাকে ভালোবাসা জানাচ্ছেন, তখন মনে পড়ছে সেই সব মায়েদের কথা, যারা সারাটি জীবন দিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু বিনিময়ে চাননি কিছুই।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত একটি গ্রামের কথা ভাবুন। নাম সুফিয়া বেগম। বয়স পঁচাত্তর ছুঁই ছুঁই। চোখে আর আগের মতো দেখেন না। হাঁটু দুটো বেঁকে গেছে বয়সের ভারে। তবু প্রতিদিন ভোরবেলা উঠে উঠানে বসে থাকেন। পথের দিকে চেয়ে থাকেন। ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে, মেয়ে ঢাকায়। মাসে একবার ফোন আসে। কখনো কখনো সেটুকুও আসে না। পাশের বাড়ির বউ এসে জিজ্ঞেস করে, ‘মা, কী দেখেন?’ সুফিয়া বেগম হাসেন। বলেন, ‘কিছু না, মা। বাতাস দেখি।’ কিন্তু আসলে তিনি দেখেন বাড়ির পথটুকু। সেই পথে কেউ আসবে এই আশায় বুকের ভেতর একটা আলো জ্বালিয়ে রাখেন। প্রতিদিন। প্রতিটি ভোরে।
এই সুফিয়া বেগম কিন্তু কাল্পনিক নন। তিনি বাংলাদেশের লাখো মায়ের প্রতিনিধি। যারা নিজের খাবার কমিয়ে সন্তানের পেট ভরিয়েছেন। যারা শীতের রাতে পাতলা কাঁথা গায়ে দিয়েছেন ভালো কম্বলটা সন্তানের গায়ে চড়িয়ে। যারা নিজের স্বপ্নকে কবর দিয়েছেন সন্তানের স্বপ্নের জন্য। ফকির আলমগীরের সেই বিখ্যাত গানে যে সত্য আছে, ‘মায়ের একধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম, পাপোষ বানাইলেও ঋণের শোধ হবে না’। শব্দগুলো শুধু গানের কথা নয়, এ আমাদের জাতীয় সত্য, আমাদের সামাজিক বাস্তবতা।
বলিউডের সেই অমর গান, ‘মা ও মেরি মা, মে তেরা লাডলা’; প্রতিটি মানুষের অন্তরে যে আকুলতা আছে মায়ের জন্য, তাকেই ভাষা দিয়েছে। সীমান্তের ওপারে হিন্দিতে হোক, আর এপারে বাংলায় হোক, মায়ের জন্য সন্তানের কান্না একই ভাষায় কাঁদে। কারণ, মাতৃপ্রেম কোনো ভৌগোলিক সীমা মানে না, কোনো ভাষার বাধা মানে না। এটি মানবজাতির সবচেয়ে আদিম ও সবচেয়ে পবিত্র অনুভূতি।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুর মানসিক বিকাশের ভিত্তি তৈরি হয় মায়ের সঙ্গে প্রথম সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু মনোবিজ্ঞানী ড. জন বোলবির সংযুক্তি তত্ত্ব বলে, মা ও শিশুর মধ্যে যে আবেগীয় বন্ধন, তা শিশুর সারাজীবনের মানসিক স্বাস্থ্য নির্ধারণ করে। যে শিশু মায়ের উষ্ণতায় বড় হয়, সে বড় হয়ে মানুষকে ভালোবাসতে পারে, বিশ্বাস করতে পারে, সম্পর্ক গড়তে পারে। আর মায়ের ভালোবাসাবঞ্চিত শিশু সারাজীবন ধরে একটা শূন্যতা বহন করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ২৮ কোটি ৫০ লাখ নারী গর্ভধারণ করেন। প্রতিটি মা এই যাত্রায় তার শরীর ও মনকে সীমাহীন কষ্টে রাখেন। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ মা প্রসবজনিত কারণে মারা যান; তাদের অধিকাংশই উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র নারী। ইউএন উইমেনের গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মা তার জীবনের গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ বছর সন্তানের জন্য অবৈতনিক পরিচর্যার কাজ করেন। যার বাজারমূল্য নির্ধারণ করলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বার্ষিক যোগ হবে ১০.৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
কিন্তু আজকের আধুনিক সমাজ কি এই ঋণের কথা মনে রাখছে? বাংলাদেশে গত এক দশকে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় অনেক মা-বাবা এখন একা থাকেন। সন্তানরা বিদেশে বা শহরে ব্যস্ত জীবনযাপনে। বছরে একবার ঈদে আসেন, কিছু টাকা পাঠান, ভাবেন দায়িত্ব পালন হয়ে গেছে। কিন্তু সুফিয়া বেগমের মতো মায়েরা টাকা চান না। তারা চান একটু সময়। একটু কথা। একটু হাতের ওপর হাত।
সমাজবিজ্ঞানীরা এই বিচ্ছিন্নতাকে বলছেন ‘কেয়ার ডেফিসিট’ অর্থাৎ যত্নের ঘাটতি। জার্মানির সমাজবিজ্ঞানী অ্যাক্সেল হনেথ বলেন, আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ মানুষকে উৎপাদনশীলতার মানদণ্ডে বিচার করতে শেখায়। বৃদ্ধ মা-বাবা যখন ‘অনুৎপাদনশীল’ হয়ে পড়েন, তখন তারা পরিবারের কেন্দ্র থেকে প্রান্তে সরে যান। এই মানসিকতাই পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে আমরা সারাদিন ফোনের পর্দায় তাকিয়ে থাকি, কিন্তু কতদিন মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েছি? কতদিন জিজ্ঞেস করেছি, ‘মা, তুমি কেমন আছো?’
প্রবাসী সন্তানের বিষয়টা আলাদাভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের লক্ষাধিক পরিবারে আজ এই চিত্র, ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে, মেয়ে মালয়েশিয়ায়, আর মা গ্রামে একা। রেমিট্যান্সের টাকায় পাকা বাড়ি উঠেছে, রঙিন টেলিভিশন আছে, কিন্তু ঘরে মানুষ নেই। মা রাতে টেলিভিশনের নীল আলোয় বসে থাকেন। মোবাইল ফোনে ছেলের ছবি দেখেন। ভিডিও কলে কয়েক মিনিট কথা বলেন। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ফোনের পর্দায় আঙুল বোলান যেন ছোঁয়া পাচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৬০ বছরের বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ। এদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একা বা অবহেলায় জীবনযাপন করছেন। জেলা সমাজসেবা অফিসের তথ্য বলছে, বৃদ্ধাশ্রমে আগত ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশেরই সন্তান আছে, তবু তারা এখানে।
চল্লিশ বছর আগের কথা। রাজশাহীর এক প্রত্যন্ত গ্রামে বাবা মারা গেলেন যখন, তখন রহিমার বড় ছেলে মিলন মাত্র বারো বছর। ছোট দুই ভাই-বোন। রহিমা একা। চাষের জমি নেই, অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। মিলনকে পড়াশোনা ছাড়তে হবে, এমন কথা গ্রামের মানুষ বলল। রহিমা বলল না। নিজে উপোষ থেকে ছেলেকে পড়িয়েছেন। ভোরবেলা অন্যের ঘরে কাজ করেছেন, বিকেলে মাঠে, রাতে সেলাই করেছেন। মিলন একদিন বিশ্ববিদ্যালয় পাস করল, চাকরি পেল, বিয়ে করল, ঢাকায় ফ্ল্যাট কিনল। রহিমাকে একবার নিয়ে গেল শহরে। কিন্তু রহিমার মন পড়ে রইল গ্রামে। ছেলের ব্যস্ত সংসারে নিজেকে অতিরিক্ত মনে হলো। ফিরে এলেন গ্রামে। একা।
মিলন ঠিকই মাসে মাসে টাকা পাঠায়। কিন্তু যেদিন রাত তিনটায় রহিমার বুকে ব্যথা উঠল, সেদিন পাশে ছিল শুধু প্রতিবেশী বুড়ি। হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল সেই বুড়িই। মিলন খবর পেয়ে পরের দিন সকালে এলো। মায়ের হাত ধরে কাঁদল। মা বললেন, ‘কাঁদিস না বাবা। তুই ভালো থাকলেই মা ভালো থাকে।’ এই একটি বাক্যে সমস্ত মায়ের জীবনদর্শন। নিজের কষ্ট গোপন করে সন্তানের সুখে আনন্দিত হওয়ার এই অপার ক্ষমতা, এটাই মাতৃত্বের সংজ্ঞা।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একাকীত্ব আজকের বিশ্বে একটি মহামারির রূপ নিয়েছে। ব্রিটিশ চিকিৎসক ড. ফে ক্রক্সটনের গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদী একাকীত্ব মানুষের আয়ু গড়ে ১৫ বছর কমিয়ে দেয়। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষণায় বলা হয়েছে, সন্তানের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন বৃদ্ধ মায়েদের মধ্যে বিষণ্নতার হার ৬৮ শতাংশ বেশি। আমরা মাকে বাঁচিয়ে রাখছি টাকা দিয়ে, কিন্তু মেরে ফেলছি অবহেলায়।
আমরা কোথায় যাচ্ছি? কোন সভ্যতার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে ‘ব্যবস্থা করে দিলাম’ ভেবে স্বস্তি পাচ্ছি? অথচ সেই মা, যিনি আমাদের প্রথম কদম মাটিতে পড়তে শেখালেন, প্রথম মা বলে ডাকতে শেখালেন, প্রথম ‘আমি পারব’ বলার সাহস দিলেন, তিনি আজ একটা ঘরের কোণে চুপ করে বসে আছেন, চোখে জল নেই, কারণ কাঁদতে কাঁদতে আর জল নেই।
একটি কথা মনে পড়ে। মিলনের মা যখন শেষবার হাসপাতালে ভর্তি হলেন, তখন ডাক্তার বললেন, ‘এখন একটু ভালো আছেন, তবে একা রাখবেন না।’ মিলন বাড়ি ফিরে অফিসের ফাইল খুলল। ভাবল, কাল থেকে দেখা যাবে। সেই রাতেই মা চলে গেলেন। শেষবার শুধু বলেছিলেন, ‘মিলন এলে বলো, আমি একটু ঘুমাচ্ছি।’ কিন্তু সে ঘুম আর ভাঙল না। মিলন সেই থেকে প্রতি রাতে ঘুমাতে পারে না। বুকের মধ্যে একটা প্রশ্ন জেগে থাকে: ‘কেন গেলাম না?’
এই ‘কেন গেলাম না’ এই অনুশোচনার আগুন নিভবে না কোনোদিন। তাই আজ, এই মুহূর্তে, এই বিশ্ব মা দিবসে যার মা বেঁচে আছেন, তিনি যেন একবার ফোন রাখুন, ট্যাবলেট বন্ধ করুন, এবং মায়ের পাশে গিয়ে বসুন। শুধু বলুন, ‘মা, তুমি কেমন আছো?’ এটুকুই যথেষ্ট। মায়ের চোখে যে আলো জ্বলে উঠবে, সেই আলো কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র জ্বালাতে পারবে না।
মনোবিজ্ঞানী ড. ব্রেনে ব্রাউন বলেন, ‘সংযোগ মানুষের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদা। কোনো অর্থ বা বস্তু এই সংযোগের বিকল্প হতে পারে না।’ আজকের প্রযুক্তির যুগে আমরা ভার্চুয়ালি সংযুক্ত, কিন্তু বাস্তবে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন। মায়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হয় হৃদয় দিয়ে, ফাইবার অপটিক কেবল দিয়ে নয়।
মা হচ্ছেন সেই মহাসমুদ্র যেখান থেকে আমরা সবাই জন্ম নিয়েছি। সমুদ্রকে কি আমরা ভুলে যেতে পারি? পারি না। তবু ভুলি। আজকের এই বিশেষ দিনে শুধু একটাই আবেদন, মাকে শুধু মা দিবসে ফুল দেবেন না। তাকে প্রতিদিন ভালোবাসুন। প্রতিদিন যোগাযোগ রাখুন। বৃদ্ধাশ্রম নয়, তাকে ঘরে রাখুন। তার কথা শুনুন। সেই পুরোনো গল্পগুলো যা আপনার কাছে পুনরাবৃত্তি মনে হয়, কিন্তু মায়ের কাছে প্রতিটি গল্পই নতুন, কারণ সেই গল্পে তিনি আপনাকে খুঁজে পান। মায়ের সঙ্গে একটা পারিবারিক সংস্কৃতি গড়ে তুলুন যেখানে বয়স্কদের সম্মান করা হয়, যেখানে মা-বাবাকে বোঝা মনে করা হয় না।
মনে রাখবেন, আমরাও একদিন বৃদ্ধ হব। আমাদের সন্তানরাও একদিন ব্যস্ত হয়ে যাবে। আমরা যেভাবে মাকে রাখব, সন্তানেরা আমাদের সেইভাবেই রাখবে। মানবিক মূল্যবোধের এই শিক্ষাটি ঘরেই শুরু হয়, মায়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের মধ্য দিয়েই। তাই মাকে ভালোবাসা শুধু ব্যক্তিগত কর্তব্য নয়, এটি সামাজিক দায়িত্ব, এটি সভ্যতার মানদণ্ড।
-1778411894700-611310666.webp&w=1920&q=75)
ছোটবেলায় রাত গভীর হলে, জ্বরে গা পুড়ে গেলে, স্বপ্নের ভেতর ভয় পেয়ে উঠলে একটাই ডাক মুখ থেকে বেরিয়ে আসত; ‘মা’। শুধু দুটি অক্ষরের একটি ডাক; কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ। সেই ডাক শুনেই যিনি অন্ধকারে ছুটে আসতেন, যার হাতের ছোঁয়ায় জ্বর কমে যেত, ভয় সরে যেত, ব্যথা মিলিয়ে যেত, তিনি মা।
আজ বিশ্ব মা দিবসে যখন কোটি কোটি মানুষ তাদের মাকে ভালোবাসা জানাচ্ছেন, তখন মনে পড়ছে সেই সব মায়েদের কথা, যারা সারাটি জীবন দিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু বিনিময়ে চাননি কিছুই।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত একটি গ্রামের কথা ভাবুন। নাম সুফিয়া বেগম। বয়স পঁচাত্তর ছুঁই ছুঁই। চোখে আর আগের মতো দেখেন না। হাঁটু দুটো বেঁকে গেছে বয়সের ভারে। তবু প্রতিদিন ভোরবেলা উঠে উঠানে বসে থাকেন। পথের দিকে চেয়ে থাকেন। ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে, মেয়ে ঢাকায়। মাসে একবার ফোন আসে। কখনো কখনো সেটুকুও আসে না। পাশের বাড়ির বউ এসে জিজ্ঞেস করে, ‘মা, কী দেখেন?’ সুফিয়া বেগম হাসেন। বলেন, ‘কিছু না, মা। বাতাস দেখি।’ কিন্তু আসলে তিনি দেখেন বাড়ির পথটুকু। সেই পথে কেউ আসবে এই আশায় বুকের ভেতর একটা আলো জ্বালিয়ে রাখেন। প্রতিদিন। প্রতিটি ভোরে।
এই সুফিয়া বেগম কিন্তু কাল্পনিক নন। তিনি বাংলাদেশের লাখো মায়ের প্রতিনিধি। যারা নিজের খাবার কমিয়ে সন্তানের পেট ভরিয়েছেন। যারা শীতের রাতে পাতলা কাঁথা গায়ে দিয়েছেন ভালো কম্বলটা সন্তানের গায়ে চড়িয়ে। যারা নিজের স্বপ্নকে কবর দিয়েছেন সন্তানের স্বপ্নের জন্য। ফকির আলমগীরের সেই বিখ্যাত গানে যে সত্য আছে, ‘মায়ের একধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম, পাপোষ বানাইলেও ঋণের শোধ হবে না’। শব্দগুলো শুধু গানের কথা নয়, এ আমাদের জাতীয় সত্য, আমাদের সামাজিক বাস্তবতা।
বলিউডের সেই অমর গান, ‘মা ও মেরি মা, মে তেরা লাডলা’; প্রতিটি মানুষের অন্তরে যে আকুলতা আছে মায়ের জন্য, তাকেই ভাষা দিয়েছে। সীমান্তের ওপারে হিন্দিতে হোক, আর এপারে বাংলায় হোক, মায়ের জন্য সন্তানের কান্না একই ভাষায় কাঁদে। কারণ, মাতৃপ্রেম কোনো ভৌগোলিক সীমা মানে না, কোনো ভাষার বাধা মানে না। এটি মানবজাতির সবচেয়ে আদিম ও সবচেয়ে পবিত্র অনুভূতি।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুর মানসিক বিকাশের ভিত্তি তৈরি হয় মায়ের সঙ্গে প্রথম সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু মনোবিজ্ঞানী ড. জন বোলবির সংযুক্তি তত্ত্ব বলে, মা ও শিশুর মধ্যে যে আবেগীয় বন্ধন, তা শিশুর সারাজীবনের মানসিক স্বাস্থ্য নির্ধারণ করে। যে শিশু মায়ের উষ্ণতায় বড় হয়, সে বড় হয়ে মানুষকে ভালোবাসতে পারে, বিশ্বাস করতে পারে, সম্পর্ক গড়তে পারে। আর মায়ের ভালোবাসাবঞ্চিত শিশু সারাজীবন ধরে একটা শূন্যতা বহন করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ২৮ কোটি ৫০ লাখ নারী গর্ভধারণ করেন। প্রতিটি মা এই যাত্রায় তার শরীর ও মনকে সীমাহীন কষ্টে রাখেন। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ মা প্রসবজনিত কারণে মারা যান; তাদের অধিকাংশই উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র নারী। ইউএন উইমেনের গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মা তার জীবনের গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ বছর সন্তানের জন্য অবৈতনিক পরিচর্যার কাজ করেন। যার বাজারমূল্য নির্ধারণ করলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বার্ষিক যোগ হবে ১০.৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
কিন্তু আজকের আধুনিক সমাজ কি এই ঋণের কথা মনে রাখছে? বাংলাদেশে গত এক দশকে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় অনেক মা-বাবা এখন একা থাকেন। সন্তানরা বিদেশে বা শহরে ব্যস্ত জীবনযাপনে। বছরে একবার ঈদে আসেন, কিছু টাকা পাঠান, ভাবেন দায়িত্ব পালন হয়ে গেছে। কিন্তু সুফিয়া বেগমের মতো মায়েরা টাকা চান না। তারা চান একটু সময়। একটু কথা। একটু হাতের ওপর হাত।
সমাজবিজ্ঞানীরা এই বিচ্ছিন্নতাকে বলছেন ‘কেয়ার ডেফিসিট’ অর্থাৎ যত্নের ঘাটতি। জার্মানির সমাজবিজ্ঞানী অ্যাক্সেল হনেথ বলেন, আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ মানুষকে উৎপাদনশীলতার মানদণ্ডে বিচার করতে শেখায়। বৃদ্ধ মা-বাবা যখন ‘অনুৎপাদনশীল’ হয়ে পড়েন, তখন তারা পরিবারের কেন্দ্র থেকে প্রান্তে সরে যান। এই মানসিকতাই পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে আমরা সারাদিন ফোনের পর্দায় তাকিয়ে থাকি, কিন্তু কতদিন মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েছি? কতদিন জিজ্ঞেস করেছি, ‘মা, তুমি কেমন আছো?’
প্রবাসী সন্তানের বিষয়টা আলাদাভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের লক্ষাধিক পরিবারে আজ এই চিত্র, ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে, মেয়ে মালয়েশিয়ায়, আর মা গ্রামে একা। রেমিট্যান্সের টাকায় পাকা বাড়ি উঠেছে, রঙিন টেলিভিশন আছে, কিন্তু ঘরে মানুষ নেই। মা রাতে টেলিভিশনের নীল আলোয় বসে থাকেন। মোবাইল ফোনে ছেলের ছবি দেখেন। ভিডিও কলে কয়েক মিনিট কথা বলেন। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ফোনের পর্দায় আঙুল বোলান যেন ছোঁয়া পাচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৬০ বছরের বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ। এদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একা বা অবহেলায় জীবনযাপন করছেন। জেলা সমাজসেবা অফিসের তথ্য বলছে, বৃদ্ধাশ্রমে আগত ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশেরই সন্তান আছে, তবু তারা এখানে।
চল্লিশ বছর আগের কথা। রাজশাহীর এক প্রত্যন্ত গ্রামে বাবা মারা গেলেন যখন, তখন রহিমার বড় ছেলে মিলন মাত্র বারো বছর। ছোট দুই ভাই-বোন। রহিমা একা। চাষের জমি নেই, অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। মিলনকে পড়াশোনা ছাড়তে হবে, এমন কথা গ্রামের মানুষ বলল। রহিমা বলল না। নিজে উপোষ থেকে ছেলেকে পড়িয়েছেন। ভোরবেলা অন্যের ঘরে কাজ করেছেন, বিকেলে মাঠে, রাতে সেলাই করেছেন। মিলন একদিন বিশ্ববিদ্যালয় পাস করল, চাকরি পেল, বিয়ে করল, ঢাকায় ফ্ল্যাট কিনল। রহিমাকে একবার নিয়ে গেল শহরে। কিন্তু রহিমার মন পড়ে রইল গ্রামে। ছেলের ব্যস্ত সংসারে নিজেকে অতিরিক্ত মনে হলো। ফিরে এলেন গ্রামে। একা।
মিলন ঠিকই মাসে মাসে টাকা পাঠায়। কিন্তু যেদিন রাত তিনটায় রহিমার বুকে ব্যথা উঠল, সেদিন পাশে ছিল শুধু প্রতিবেশী বুড়ি। হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল সেই বুড়িই। মিলন খবর পেয়ে পরের দিন সকালে এলো। মায়ের হাত ধরে কাঁদল। মা বললেন, ‘কাঁদিস না বাবা। তুই ভালো থাকলেই মা ভালো থাকে।’ এই একটি বাক্যে সমস্ত মায়ের জীবনদর্শন। নিজের কষ্ট গোপন করে সন্তানের সুখে আনন্দিত হওয়ার এই অপার ক্ষমতা, এটাই মাতৃত্বের সংজ্ঞা।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একাকীত্ব আজকের বিশ্বে একটি মহামারির রূপ নিয়েছে। ব্রিটিশ চিকিৎসক ড. ফে ক্রক্সটনের গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদী একাকীত্ব মানুষের আয়ু গড়ে ১৫ বছর কমিয়ে দেয়। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষণায় বলা হয়েছে, সন্তানের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন বৃদ্ধ মায়েদের মধ্যে বিষণ্নতার হার ৬৮ শতাংশ বেশি। আমরা মাকে বাঁচিয়ে রাখছি টাকা দিয়ে, কিন্তু মেরে ফেলছি অবহেলায়।
আমরা কোথায় যাচ্ছি? কোন সভ্যতার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে ‘ব্যবস্থা করে দিলাম’ ভেবে স্বস্তি পাচ্ছি? অথচ সেই মা, যিনি আমাদের প্রথম কদম মাটিতে পড়তে শেখালেন, প্রথম মা বলে ডাকতে শেখালেন, প্রথম ‘আমি পারব’ বলার সাহস দিলেন, তিনি আজ একটা ঘরের কোণে চুপ করে বসে আছেন, চোখে জল নেই, কারণ কাঁদতে কাঁদতে আর জল নেই।
একটি কথা মনে পড়ে। মিলনের মা যখন শেষবার হাসপাতালে ভর্তি হলেন, তখন ডাক্তার বললেন, ‘এখন একটু ভালো আছেন, তবে একা রাখবেন না।’ মিলন বাড়ি ফিরে অফিসের ফাইল খুলল। ভাবল, কাল থেকে দেখা যাবে। সেই রাতেই মা চলে গেলেন। শেষবার শুধু বলেছিলেন, ‘মিলন এলে বলো, আমি একটু ঘুমাচ্ছি।’ কিন্তু সে ঘুম আর ভাঙল না। মিলন সেই থেকে প্রতি রাতে ঘুমাতে পারে না। বুকের মধ্যে একটা প্রশ্ন জেগে থাকে: ‘কেন গেলাম না?’
এই ‘কেন গেলাম না’ এই অনুশোচনার আগুন নিভবে না কোনোদিন। তাই আজ, এই মুহূর্তে, এই বিশ্ব মা দিবসে যার মা বেঁচে আছেন, তিনি যেন একবার ফোন রাখুন, ট্যাবলেট বন্ধ করুন, এবং মায়ের পাশে গিয়ে বসুন। শুধু বলুন, ‘মা, তুমি কেমন আছো?’ এটুকুই যথেষ্ট। মায়ের চোখে যে আলো জ্বলে উঠবে, সেই আলো কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র জ্বালাতে পারবে না।
মনোবিজ্ঞানী ড. ব্রেনে ব্রাউন বলেন, ‘সংযোগ মানুষের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদা। কোনো অর্থ বা বস্তু এই সংযোগের বিকল্প হতে পারে না।’ আজকের প্রযুক্তির যুগে আমরা ভার্চুয়ালি সংযুক্ত, কিন্তু বাস্তবে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন। মায়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হয় হৃদয় দিয়ে, ফাইবার অপটিক কেবল দিয়ে নয়।
মা হচ্ছেন সেই মহাসমুদ্র যেখান থেকে আমরা সবাই জন্ম নিয়েছি। সমুদ্রকে কি আমরা ভুলে যেতে পারি? পারি না। তবু ভুলি। আজকের এই বিশেষ দিনে শুধু একটাই আবেদন, মাকে শুধু মা দিবসে ফুল দেবেন না। তাকে প্রতিদিন ভালোবাসুন। প্রতিদিন যোগাযোগ রাখুন। বৃদ্ধাশ্রম নয়, তাকে ঘরে রাখুন। তার কথা শুনুন। সেই পুরোনো গল্পগুলো যা আপনার কাছে পুনরাবৃত্তি মনে হয়, কিন্তু মায়ের কাছে প্রতিটি গল্পই নতুন, কারণ সেই গল্পে তিনি আপনাকে খুঁজে পান। মায়ের সঙ্গে একটা পারিবারিক সংস্কৃতি গড়ে তুলুন যেখানে বয়স্কদের সম্মান করা হয়, যেখানে মা-বাবাকে বোঝা মনে করা হয় না।
মনে রাখবেন, আমরাও একদিন বৃদ্ধ হব। আমাদের সন্তানরাও একদিন ব্যস্ত হয়ে যাবে। আমরা যেভাবে মাকে রাখব, সন্তানেরা আমাদের সেইভাবেই রাখবে। মানবিক মূল্যবোধের এই শিক্ষাটি ঘরেই শুরু হয়, মায়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের মধ্য দিয়েই। তাই মাকে ভালোবাসা শুধু ব্যক্তিগত কর্তব্য নয়, এটি সামাজিক দায়িত্ব, এটি সভ্যতার মানদণ্ড।
-1778411894700-611310666.webp&w=1920&q=75)
ছোটবেলায় রাত গভীর হলে, জ্বরে গা পুড়ে গেলে, স্বপ্নের ভেতর ভয় পেয়ে উঠলে একটাই ডাক মুখ থেকে বেরিয়ে আসত; ‘মা’। শুধু দুটি অক্ষরের একটি ডাক; কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ। সেই ডাক শুনেই যিনি অন্ধকারে ছুটে আসতেন, যার হাতের ছোঁয়ায় জ্বর কমে যেত, ভয় সরে যেত, ব্যথা মিলিয়ে যেত, তিনি মা।
আজ বিশ্ব মা দিবসে যখন কোটি কোটি মানুষ তাদের মাকে ভালোবাসা জানাচ্ছেন, তখন মনে পড়ছে সেই সব মায়েদের কথা, যারা সারাটি জীবন দিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু বিনিময়ে চাননি কিছুই।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত একটি গ্রামের কথা ভাবুন। নাম সুফিয়া বেগম। বয়স পঁচাত্তর ছুঁই ছুঁই। চোখে আর আগের মতো দেখেন না। হাঁটু দুটো বেঁকে গেছে বয়সের ভারে। তবু প্রতিদিন ভোরবেলা উঠে উঠানে বসে থাকেন। পথের দিকে চেয়ে থাকেন। ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে, মেয়ে ঢাকায়। মাসে একবার ফোন আসে। কখনো কখনো সেটুকুও আসে না। পাশের বাড়ির বউ এসে জিজ্ঞেস করে, ‘মা, কী দেখেন?’ সুফিয়া বেগম হাসেন। বলেন, ‘কিছু না, মা। বাতাস দেখি।’ কিন্তু আসলে তিনি দেখেন বাড়ির পথটুকু। সেই পথে কেউ আসবে এই আশায় বুকের ভেতর একটা আলো জ্বালিয়ে রাখেন। প্রতিদিন। প্রতিটি ভোরে।
এই সুফিয়া বেগম কিন্তু কাল্পনিক নন। তিনি বাংলাদেশের লাখো মায়ের প্রতিনিধি। যারা নিজের খাবার কমিয়ে সন্তানের পেট ভরিয়েছেন। যারা শীতের রাতে পাতলা কাঁথা গায়ে দিয়েছেন ভালো কম্বলটা সন্তানের গায়ে চড়িয়ে। যারা নিজের স্বপ্নকে কবর দিয়েছেন সন্তানের স্বপ্নের জন্য। ফকির আলমগীরের সেই বিখ্যাত গানে যে সত্য আছে, ‘মায়ের একধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম, পাপোষ বানাইলেও ঋণের শোধ হবে না’। শব্দগুলো শুধু গানের কথা নয়, এ আমাদের জাতীয় সত্য, আমাদের সামাজিক বাস্তবতা।
বলিউডের সেই অমর গান, ‘মা ও মেরি মা, মে তেরা লাডলা’; প্রতিটি মানুষের অন্তরে যে আকুলতা আছে মায়ের জন্য, তাকেই ভাষা দিয়েছে। সীমান্তের ওপারে হিন্দিতে হোক, আর এপারে বাংলায় হোক, মায়ের জন্য সন্তানের কান্না একই ভাষায় কাঁদে। কারণ, মাতৃপ্রেম কোনো ভৌগোলিক সীমা মানে না, কোনো ভাষার বাধা মানে না। এটি মানবজাতির সবচেয়ে আদিম ও সবচেয়ে পবিত্র অনুভূতি।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুর মানসিক বিকাশের ভিত্তি তৈরি হয় মায়ের সঙ্গে প্রথম সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু মনোবিজ্ঞানী ড. জন বোলবির সংযুক্তি তত্ত্ব বলে, মা ও শিশুর মধ্যে যে আবেগীয় বন্ধন, তা শিশুর সারাজীবনের মানসিক স্বাস্থ্য নির্ধারণ করে। যে শিশু মায়ের উষ্ণতায় বড় হয়, সে বড় হয়ে মানুষকে ভালোবাসতে পারে, বিশ্বাস করতে পারে, সম্পর্ক গড়তে পারে। আর মায়ের ভালোবাসাবঞ্চিত শিশু সারাজীবন ধরে একটা শূন্যতা বহন করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ২৮ কোটি ৫০ লাখ নারী গর্ভধারণ করেন। প্রতিটি মা এই যাত্রায় তার শরীর ও মনকে সীমাহীন কষ্টে রাখেন। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ মা প্রসবজনিত কারণে মারা যান; তাদের অধিকাংশই উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র নারী। ইউএন উইমেনের গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মা তার জীবনের গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ বছর সন্তানের জন্য অবৈতনিক পরিচর্যার কাজ করেন। যার বাজারমূল্য নির্ধারণ করলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বার্ষিক যোগ হবে ১০.৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
কিন্তু আজকের আধুনিক সমাজ কি এই ঋণের কথা মনে রাখছে? বাংলাদেশে গত এক দশকে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় অনেক মা-বাবা এখন একা থাকেন। সন্তানরা বিদেশে বা শহরে ব্যস্ত জীবনযাপনে। বছরে একবার ঈদে আসেন, কিছু টাকা পাঠান, ভাবেন দায়িত্ব পালন হয়ে গেছে। কিন্তু সুফিয়া বেগমের মতো মায়েরা টাকা চান না। তারা চান একটু সময়। একটু কথা। একটু হাতের ওপর হাত।
সমাজবিজ্ঞানীরা এই বিচ্ছিন্নতাকে বলছেন ‘কেয়ার ডেফিসিট’ অর্থাৎ যত্নের ঘাটতি। জার্মানির সমাজবিজ্ঞানী অ্যাক্সেল হনেথ বলেন, আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজ মানুষকে উৎপাদনশীলতার মানদণ্ডে বিচার করতে শেখায়। বৃদ্ধ মা-বাবা যখন ‘অনুৎপাদনশীল’ হয়ে পড়েন, তখন তারা পরিবারের কেন্দ্র থেকে প্রান্তে সরে যান। এই মানসিকতাই পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে আমরা সারাদিন ফোনের পর্দায় তাকিয়ে থাকি, কিন্তু কতদিন মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েছি? কতদিন জিজ্ঞেস করেছি, ‘মা, তুমি কেমন আছো?’
প্রবাসী সন্তানের বিষয়টা আলাদাভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের লক্ষাধিক পরিবারে আজ এই চিত্র, ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে, মেয়ে মালয়েশিয়ায়, আর মা গ্রামে একা। রেমিট্যান্সের টাকায় পাকা বাড়ি উঠেছে, রঙিন টেলিভিশন আছে, কিন্তু ঘরে মানুষ নেই। মা রাতে টেলিভিশনের নীল আলোয় বসে থাকেন। মোবাইল ফোনে ছেলের ছবি দেখেন। ভিডিও কলে কয়েক মিনিট কথা বলেন। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ফোনের পর্দায় আঙুল বোলান যেন ছোঁয়া পাচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৬০ বছরের বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ। এদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একা বা অবহেলায় জীবনযাপন করছেন। জেলা সমাজসেবা অফিসের তথ্য বলছে, বৃদ্ধাশ্রমে আগত ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশেরই সন্তান আছে, তবু তারা এখানে।
চল্লিশ বছর আগের কথা। রাজশাহীর এক প্রত্যন্ত গ্রামে বাবা মারা গেলেন যখন, তখন রহিমার বড় ছেলে মিলন মাত্র বারো বছর। ছোট দুই ভাই-বোন। রহিমা একা। চাষের জমি নেই, অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। মিলনকে পড়াশোনা ছাড়তে হবে, এমন কথা গ্রামের মানুষ বলল। রহিমা বলল না। নিজে উপোষ থেকে ছেলেকে পড়িয়েছেন। ভোরবেলা অন্যের ঘরে কাজ করেছেন, বিকেলে মাঠে, রাতে সেলাই করেছেন। মিলন একদিন বিশ্ববিদ্যালয় পাস করল, চাকরি পেল, বিয়ে করল, ঢাকায় ফ্ল্যাট কিনল। রহিমাকে একবার নিয়ে গেল শহরে। কিন্তু রহিমার মন পড়ে রইল গ্রামে। ছেলের ব্যস্ত সংসারে নিজেকে অতিরিক্ত মনে হলো। ফিরে এলেন গ্রামে। একা।
মিলন ঠিকই মাসে মাসে টাকা পাঠায়। কিন্তু যেদিন রাত তিনটায় রহিমার বুকে ব্যথা উঠল, সেদিন পাশে ছিল শুধু প্রতিবেশী বুড়ি। হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল সেই বুড়িই। মিলন খবর পেয়ে পরের দিন সকালে এলো। মায়ের হাত ধরে কাঁদল। মা বললেন, ‘কাঁদিস না বাবা। তুই ভালো থাকলেই মা ভালো থাকে।’ এই একটি বাক্যে সমস্ত মায়ের জীবনদর্শন। নিজের কষ্ট গোপন করে সন্তানের সুখে আনন্দিত হওয়ার এই অপার ক্ষমতা, এটাই মাতৃত্বের সংজ্ঞা।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একাকীত্ব আজকের বিশ্বে একটি মহামারির রূপ নিয়েছে। ব্রিটিশ চিকিৎসক ড. ফে ক্রক্সটনের গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদী একাকীত্ব মানুষের আয়ু গড়ে ১৫ বছর কমিয়ে দেয়। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষণায় বলা হয়েছে, সন্তানের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন বৃদ্ধ মায়েদের মধ্যে বিষণ্নতার হার ৬৮ শতাংশ বেশি। আমরা মাকে বাঁচিয়ে রাখছি টাকা দিয়ে, কিন্তু মেরে ফেলছি অবহেলায়।
আমরা কোথায় যাচ্ছি? কোন সভ্যতার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে ‘ব্যবস্থা করে দিলাম’ ভেবে স্বস্তি পাচ্ছি? অথচ সেই মা, যিনি আমাদের প্রথম কদম মাটিতে পড়তে শেখালেন, প্রথম মা বলে ডাকতে শেখালেন, প্রথম ‘আমি পারব’ বলার সাহস দিলেন, তিনি আজ একটা ঘরের কোণে চুপ করে বসে আছেন, চোখে জল নেই, কারণ কাঁদতে কাঁদতে আর জল নেই।
একটি কথা মনে পড়ে। মিলনের মা যখন শেষবার হাসপাতালে ভর্তি হলেন, তখন ডাক্তার বললেন, ‘এখন একটু ভালো আছেন, তবে একা রাখবেন না।’ মিলন বাড়ি ফিরে অফিসের ফাইল খুলল। ভাবল, কাল থেকে দেখা যাবে। সেই রাতেই মা চলে গেলেন। শেষবার শুধু বলেছিলেন, ‘মিলন এলে বলো, আমি একটু ঘুমাচ্ছি।’ কিন্তু সে ঘুম আর ভাঙল না। মিলন সেই থেকে প্রতি রাতে ঘুমাতে পারে না। বুকের মধ্যে একটা প্রশ্ন জেগে থাকে: ‘কেন গেলাম না?’
এই ‘কেন গেলাম না’ এই অনুশোচনার আগুন নিভবে না কোনোদিন। তাই আজ, এই মুহূর্তে, এই বিশ্ব মা দিবসে যার মা বেঁচে আছেন, তিনি যেন একবার ফোন রাখুন, ট্যাবলেট বন্ধ করুন, এবং মায়ের পাশে গিয়ে বসুন। শুধু বলুন, ‘মা, তুমি কেমন আছো?’ এটুকুই যথেষ্ট। মায়ের চোখে যে আলো জ্বলে উঠবে, সেই আলো কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র জ্বালাতে পারবে না।
মনোবিজ্ঞানী ড. ব্রেনে ব্রাউন বলেন, ‘সংযোগ মানুষের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদা। কোনো অর্থ বা বস্তু এই সংযোগের বিকল্প হতে পারে না।’ আজকের প্রযুক্তির যুগে আমরা ভার্চুয়ালি সংযুক্ত, কিন্তু বাস্তবে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন। মায়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হয় হৃদয় দিয়ে, ফাইবার অপটিক কেবল দিয়ে নয়।
মা হচ্ছেন সেই মহাসমুদ্র যেখান থেকে আমরা সবাই জন্ম নিয়েছি। সমুদ্রকে কি আমরা ভুলে যেতে পারি? পারি না। তবু ভুলি। আজকের এই বিশেষ দিনে শুধু একটাই আবেদন, মাকে শুধু মা দিবসে ফুল দেবেন না। তাকে প্রতিদিন ভালোবাসুন। প্রতিদিন যোগাযোগ রাখুন। বৃদ্ধাশ্রম নয়, তাকে ঘরে রাখুন। তার কথা শুনুন। সেই পুরোনো গল্পগুলো যা আপনার কাছে পুনরাবৃত্তি মনে হয়, কিন্তু মায়ের কাছে প্রতিটি গল্পই নতুন, কারণ সেই গল্পে তিনি আপনাকে খুঁজে পান। মায়ের সঙ্গে একটা পারিবারিক সংস্কৃতি গড়ে তুলুন যেখানে বয়স্কদের সম্মান করা হয়, যেখানে মা-বাবাকে বোঝা মনে করা হয় না।
মনে রাখবেন, আমরাও একদিন বৃদ্ধ হব। আমাদের সন্তানরাও একদিন ব্যস্ত হয়ে যাবে। আমরা যেভাবে মাকে রাখব, সন্তানেরা আমাদের সেইভাবেই রাখবে। মানবিক মূল্যবোধের এই শিক্ষাটি ঘরেই শুরু হয়, মায়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের মধ্য দিয়েই। তাই মাকে ভালোবাসা শুধু ব্যক্তিগত কর্তব্য নয়, এটি সামাজিক দায়িত্ব, এটি সভ্যতার মানদণ্ড।
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!