
ঈদের ছুটি শেষে যখন ঢাকায় ফিরছিলেন তারা, ঠিক তখনই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় থমকে যায় বহু প্রাণ। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবির ঘটনায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন। ফেরিঘাটের অব্যস্থাপনা, বাস চালকের অদক্ষতা নাকি ঘাটে ওঠার সময় বাসের ভেতর বসে থাকা যাত্রীদের অসচেতনতা- কোনটি দায়ী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও সচেতনতার ঘাটতি রয়েই গেছে। যাত্রীরা দোষারোপ করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টদের, এদিকে নিয়ম না মেনেই আগের মতোই ফেরিতে উঠছে বাসগুলো। সরেজমিনে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় গিয়ে এসব চিত্রই চোখে পড়ে।
রেলিংবিহীন অরক্ষিত পন্টুন, ঢালু ও খানাখন্দে ভরা সংযোগ সড়ক, ফেরিতে আগে উঠতে যানবাহনগুলোর প্রতিযোগিতা এবং অব্যবস্থাপনা ও সবার অসচেতনতায় ফেরিঘাট যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। যার কারণে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার পেছনে স্থানীয় বিআইডব্লিউটিসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে।
নিয়ম অনুযায়ী, ঘাট পার হতে আসা যানবাহন পন্টুনে ওঠার আগের সড়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে। এরপর ঘাটে আসা ফেরি থেকে সব যানবাহন নেমে যাওয়ার পর অপেক্ষায় থাকা যানবাহনগুলো ফেরিতে উঠবে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, গত বুধবার বিকেলে হাসনা হেনা নামের ফেরিটি ঘাটে এসে পৌঁছাতেই সংযোগ সড়ক থেকে চলতে শুরু করে বাসটি, যা সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ে।
সরেজমিনে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট ঘুরে দেখা যায়, এত বড় দুর্ঘটনার পরও বাসগুলো নিয়ম না মেনে আগের মতোই প্রতিযোগিতা করে ফেরিতে উঠছে। ফেরিঘাটে না থাকলেও বাসসহ অন্যান্য যানবাহনগুলো সংযোগ সড়ক ও পন্টুনে দাঁড়িয়ে ফেরির জন্য অপেক্ষা করছে। বাস ভর্তি যাত্রী নিয়ে চলছে ওঠানামার কাজ। কিছু কিছু সচেতন যাত্রীরা ফেরিঘাটে এসে আতঙ্কে বাস থেকে নেমে গেলেও সিংহভাগ যাত্রীদের মাঝে নেই সচেতনতা। আবার চালকদের মাঝেও নেই কোনো সচেতনতার বালাই। তারাও প্রতিযোগিতা করে কে কার আগে ফেরিতে উঠবে সেই চেষ্টায় রয়েছে। এসব দেখভালের বিষয়ে উদাসীন ঘাট কর্তৃপক্ষ। এমনকি থেকে যাত্রীদের সচেতন করার জন্য কোনো মাইকিং করতেও দেখা যায়নি।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, দৌলতদিয়ায় ৭টি ফেরিঘাটের মধ্যে ১, ২, ৫ ও ৬নং ঘাট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। যানবাহন ও যাত্রী পারাপারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ৩, ৪ ও ৭নং ফেরিঘাট। ফেরি ঘাটে নদীর পানি কমে যাওয়ার কারণে সংযোগ সড়ক বেশি ঢালু ও খাড়া হয়ে পড়েছে। এ কারণে যানবাহনগুলোকে ফেরিতে উঠতে গিয়ে ও নামতে গিয়ে চরম বেগ পেতে হচ্ছে। ফলে প্রায়ই ভারী যানবাহনগুলো ফেরিতে উঠতে ও নামতে গিয়ে ঘটছে দুর্ঘটনা।
লঞ্চ ঘাটের অবস্থা আরও খারাপ। দীর্ঘদিন আগে লঞ্চঘাটে যাওয়ার পাটাতন ভেঙে পড়ে রয়েছে। নিচে বালুর বস্তা দিয়ে যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য কাঠের পাটাতন দেওয়া হয়েছে। সেটিও এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানেও ঘটতে পারে দুঘর্টনা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া দিয়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার যানবাহন পারাপার হয়। পদ্মার পানি কমে যাওয়ায় দৌলতদিয়া ঘাটের সবগুলো সংযোগ সড়ক স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ উঁচু হয়েছে। যে কারণে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট বড় দুর্ঘটনা-ধুলোবালিতে একাকার থাকছে পুরো ঘাট এলাকা।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ফেরিঘাটের সংযোগ সড়ক প্রায়ই মেরামত করা হয়। তবে সেটি স্থায়ী নয়, কিছু ইট, সুরকি ফেলে কোনো মতে চলাচল করার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু প্রতিবছরই ঘাটের সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য সব মেরামতের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়। সেই অর্থ যায় কাদের পকেটে বিষয়টি খতিয়ে দেখে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পরিবার নিয়ে রাজবাড়ী থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনে ঢাকায় যাচ্ছেন আহসান হাবীব। দৌলতদিয়া ৭নং ফেরিঘাটে এসে তিনি স্বপরিবারে বাস থেকে নেমে যান। এসময় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, কিছু আগে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গেল এ কারণে বাস থেকে নেমে গিয়েছি। প্রত্যেকটি যাত্রীর উচিত ঘাট এসে বাস থেকে নেমে গিয়ে বাস যখন ফেরিতে উঠবে তখন বাসে ওঠা। এই নিয়মটা সবার পালন করা উচিত। তা না হলে নিজেদের ভুলের কারণে বিপদগ্রস্ত হবে।
বাস কর্তৃপক্ষ নেমে যাওয়ার জন্য কিছু বলেছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাস থেকে নামার জন্য কেউ বলেনি। আমরা নিজ উদ্যোগে নেমেছি।
জেআর পরিবহনে মাকে নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন মোছা. শিউলি খাতুন। ৭নং ফেরিঘাটে এলাকায় দেখা যায় তিনি বাস থেকে নেমে পন্টুনে এসে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রয়েছে, তারপরও বলা যায় না যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে। এজন্য বাস থেকে নেমে দাঁড়িয়েছি। কয়েকদিন আগেই দেখলাম একটা বাস ব্রেক ফেল করে নদীতে পড়ে গেছে।
দর্শনা ডিলাক্স পরিবহনের যাত্রী ইয়াসমিন আরা বলেন, বাসের কর্তৃপক্ষ আমাদের নামার জন্য বলেছে, তাই নেমে এসেছি। কিন্তু আমাদের নিজেদেরও সচেতন হওয়ার দরকার আছে। কিন্তু আমরা নিজেরা যদি সতর্ক না হই তাহলে দেখা যায় ড্রাইভারের কারণে, সুপারভাইজারের কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিছু কিছু নতুন হেলপার যারা রয়েছে তারা গাড়ি চালানোর জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে, তাদের হাতে ড্রাইভাররা গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে।
ফেরিঘাটে ঢাকাগামী গোল্ডেন লাইন, রাজধানী এক্সপ্রেস, রয়েল এক্সপ্রেস, রাবেয়া পরিবহন, পূর্বাশাসহ একাধিক বাসের যাত্রীদের ঘাটে এসে বাস থেকে নামতে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে যাত্রীদের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, ঘাট এলাকায় প্রচুর ধুলাবালির কারণে তারা বাস থেকে নামছেন না।এছাড়া বাসে তাদের ব্যাগপত্র, মূল্যবান জিনিস রয়েছে। যে কারণে সেগুলোর নিরাপত্তার জন্য তারে বাসেই বসে রয়েছেন।
সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস ৭নং ফেরিঘাটে ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিল। এসময় বাসের যাত্রী ইয়াসমিন আক্তারের সঙ্গে কথা হয়। ঘাটে এসে বাস থেকে কেন নামলেন না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাচ্চাকাচ্চা ও সঙ্গে ব্যাগপত্র রয়েছে যে কারণে বাস থেকে নামিনি। এছাড়া ঘাটে প্রচুর ধুলাবালি। আমার শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে।
দর্শনা ডিলাক্সের যাত্রী শারমিন আক্তার লুবনা মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছিলেন ঢাকায়। ফেরিঘাটে এসে বাস থেকে না নামার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাসের কর্তৃপক্ষ আমাদের বাস থেকে নামার জন্য কোনো নির্দেশনা দেয়নি। যে কারণে বাস থেকে নামিনি।
অপর এক যাত্রী রবিন শেখ বলেন, ঘাটের যে দুর্দশা এর মধ্যে বাস থেকে না নামাই ভালো। ধুলাবালিতে জর্জরিত ঘাট এলাকা। বাস থেকে নেমে হেঁটে যে পন্টুনে দাঁড়াব ধুলাবালিতে শরীর ভরে যাবে।
যাত্রী নামিয়ে ঘাটে কেন উঠছে না এই প্রশ্নেরে উত্তরে দর্শনা ডিলাক্সের চালক সানি বলেন, কর্তৃপক্ষ আমাকে বাস থেকে যাত্রী নামাতে বলেনি, তাহলে কিভাবে আমরা যাত্রী নামিয়ে দিয়ে যাব। যাত্রীদের নামিয়ে দিলে ফেরিতে উঠতে গেলে তাদের অতিরিক্ত ৪০ টাকা দিতে হবে, কিন্তু তারা তো সেই টাকা দেবে না। বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ আমাকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
রাজধানী এক্সপ্রেসের চালক জাফর আলী ৭নং ফেরিঘাটে ফেরিতে উঠার জন্য সংযোগ সড়কে অপেক্ষা করছেন। বাস থেকে যাত্রীদের নেমে যাওয়ার জন্য কোনো নির্দেশনা দিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যাত্রীদের কয়েকবার বলা হয়েছে বাস থেকে নেমে যেতে, কিন্তু তারা নামছেন না। কারণ তাদের ব্যাগপত্র, মালছামান, বাচ্চাকাচ্চা, ছেলেমেয়ে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঘাটের অবস্থা ভয়াবহ, আমরা কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি না। এই যে সৌহার্দ্য গাড়ি পড়ে গেল কিসের জন্য, পন্টুনের দুই সাইডে কোনো রেলিং না থাকার কারণে। ফেরির পন্টুনে দুইপাশে ডালা থাকার কথা, কিন্তু নেই। আমরা যখন ঢাল থেকে নামি তখন যদি ব্রেক না ধরি সেসময় পন্টুনে যদি উঁচু কিছু থাকে সেখানে আটকে যাবে। কিন্তু ফেরির পন্টুনে এমন কিছু নেই। এটা আমাদের জন্য ঝুঁকি হয়ে যাচ্ছে। তাই আমরা চাচ্ছি ফেরির পন্টুনের দুপাশে রেলিং দিয়ে দেওয়া হোক এবং ঢাল জায়গায় মাটি দিয়ে উঁচু করে দেওয়া হোক।
৭নং ফেরিঘাট দায়িত্বরত বিআইডব্লিউটিসির ফেরিঘাটের টিএস মো.আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে প্রত্যেকটি বাসকে বলে দিচ্ছি যাত্রী নামানোর জন্য। সেক্ষেত্রে কিছু যাত্রী নামছে, কিছু যাত্রী নামছে না।মহিলা যারা রয়েছেন তারা নামতে চান না সাধারণত।
ঘাটের সংযোগ সড়ক ও পন্টুনের এমন নাজুক অবস্থার বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ আরিচা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শেরে মসতানকে প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যান। তার ফোনে কল আসছে বলে তিনি দ্রুত সরে যান।
দৌলতদিয়া ৩নং ফেরিঘাটে পাওয়া যায় বিআইডব্লিউটিএ আরিচা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল আলমকে। তার কাছে সংযোগ সড়ক ও পন্টুনের সংস্কার বা উন্নয়ন কেন করা হয় না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা নদী ভাঙন কবলিত এলাকা। প্রতি বছরই ভাঙনের সম্ভবনা থাকে। তাই আমরা চাইলেও স্থায়ীভাবে পাকা করে করার সুযোগ নেই। আমাদের নদীর পানি যখন বাড়ে এবং যখন কমে তখন ঘাটগুলোকে পানির সঙ্গে সমন্বয় করে উঠাতে হয় এবং নামাতে হয়। আমাদের ঘাটের ঢালে কোনো সমস্যা নেই, এ কারণে গাড়ি উঠানামা করতেও সমস্যা নেই।
ঘাট সংস্কার বা উন্নয়ন করতে প্রতি বছর রাষ্ট্রের কয়েক কোটি টাকা খরচ হচ্ছে তারপরও ঘাটের উন্নয়ন নেই কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দৌলতদিয়ায় ৩টি রানিং ফেরিঘাট। একটা ঘাটে তিনটি করে স্টেজ- লো, মিড ও হাই। তার মানে ৯টা ঘাটকে সারাবছর সংরক্ষণ ও মেরামত করার জন্য বাৎসরিকভাবে ঠিকাদার নিয়োগ করা আছে। এই ঘাট মেরামতের জন্য সারাবছর ৫০ লাখ টাকা বাজেট দেওয়া আছে। এই টাকা খুবই সামান্য বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ১৯৬৩ সালের ৩১ মার্চ থেকে দৌলতদিয়া-আরিচা ফেরি সার্ভিস চালু হয়। সেই ১৯৬৩ সাল থেকে বিআইডব্লিউটিএ সার্বক্ষণিক ফেরি সার্ভিস সচল রাখার জন্য এ ঘাটে বিভিন্ন কার্যক্রম করে সেবা দিয়ে আসছে।
ফেরি ঘাটে কোনো সমস্যা নেই দাবি করে এই কর্মকর্তা বলেন, আমাদের ফেরিঘাটের স্লপ যথেষ্ট ভালো আছে এবং সব গাড়ি উঠছে। শুধুমাত্র সেসব গাড়ি উঠতে পারে না যেসব গাড়ির ফিটনেস নেই, পাশাপাশি যেসব গাড়ি ওভারলোড নিয়ে আসে। ওভারলোড গাড়িগুলোর জন্য আমাদের ফেরিঘাটের এ্যাপ্রোচ সড়ক, জাতীয় মহাসড়ক ও ফেরিতেও সমস্যা হচ্ছে। এগুলোকে আমাদের বন্ধ করা উচিত। এই ওভারলোড গাড়িগুলোর জন্যেই দুর্ঘটনা ঘটছে।
বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সহকারী মহা ব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, আমরা বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে যাত্রীদের সবসময় অনুরোধ করি বাস থেকে নেমে যাওয়ার জন্য এবং বাস চালকদের অনুরোধ করি খালি গাড়ি ফেরিতে উঠানোর জন্য। এমনকি আমাদের টিকিটের পিছনেও এমন নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। দুর্ঘটনা কবলিত ঘাটটিও আমাদের বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান পরিদর্শন করেছেন। তিনিও যাত্রীদের বাস থেকে নেমে ফেরিতে ওঠার নির্দেশনা দিয়েছেন।
বাস ডুবে যাওয়ার ঘটনায় বিআইডব্লিউটিসির কোনো গাফিলতি ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৩নং ফেরিঘাটে অপেক্ষমান থাকা সৌহার্দ্য পরিবহনের বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ব্রেক ফেল হয়ে নদীতে পড়ে যায়। এই বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। তবে এ ঘটনায় বিআইডব্লিউটিসির কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দায় বা গাফিলতি নেই। এ বিষয়ে সরকারের দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে তদন্ত কমিটির আমি একজন সদস্য। তদন্ত কাজে আমি সার্বিক সহযোগিতা করছি।
পন্টুন ব্যবস্থাপনায় কোনো দুর্বলতা ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, পন্টুন ব্যবস্থাপনাটি আমাদের নৌ বিভাগের কর্মকর্তারা দেখেন। নৌবিদ্যা রিলেটেড যাদের পড়াশোনা আছে এবং আমাদের মেরিন বিভাগের সংশ্লিষ্ট যারা এক্সপার্ট রয়েছেন তারা এ বিষয়টি দেখেন। পন্টুনের বিষয়টি আমাদের নৌ বিভাগের এক্সপার্টরা বলতে পারবে।
বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ দৌলতদিয়া ঘাট পরিদর্শনে এসে বলেন, পন্টুনগুলোতে নিরাপত্তার স্বার্থে রেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে, যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। যারা ফেরি ও ঘাট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত, তাদের আধুনিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে ঘাটের জরাজীর্ণতা দূর করতে দ্রুত সমাধানের কথাও জানান তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, সাধারণত গাড়িগুলো পন্টুনে আসার আগে থামে। এরপর সুবিধামতো ফেরিতে উঠে পড়ে। কিন্তু দুর্ঘটনার সময় দেখা গেছে, হাসনা হেনা ফেরিটি প্রস্তুত ছিল না, তার আগেই চালকের ভুলে গাড়িটি পন্টুনে এসেছে। নিয়ম হলো- ফেরিতে থাকা গাড়িগুলো আগে নামবে, এরপর নতুন করে যানবাহন উঠবে।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, সরকার এরই মধ্যে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে ঘাট ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ণে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বলেন, নিহতদের দাফনের জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়েও সরকার কাজ করবে।
তবে এই দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানির নয় বরং ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, নিরাপত্তা ঘাটতি এবং দায়িত্বহীনতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। স্বজন হারানোর বেদনা আর প্রশাসনিক জবাবদিহির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট।

ঈদের ছুটি শেষে যখন ঢাকায় ফিরছিলেন তারা, ঠিক তখনই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় থমকে যায় বহু প্রাণ। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবির ঘটনায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন। ফেরিঘাটের অব্যস্থাপনা, বাস চালকের অদক্ষতা নাকি ঘাটে ওঠার সময় বাসের ভেতর বসে থাকা যাত্রীদের অসচেতনতা- কোনটি দায়ী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও সচেতনতার ঘাটতি রয়েই গেছে। যাত্রীরা দোষারোপ করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টদের, এদিকে নিয়ম না মেনেই আগের মতোই ফেরিতে উঠছে বাসগুলো। সরেজমিনে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় গিয়ে এসব চিত্রই চোখে পড়ে।
রেলিংবিহীন অরক্ষিত পন্টুন, ঢালু ও খানাখন্দে ভরা সংযোগ সড়ক, ফেরিতে আগে উঠতে যানবাহনগুলোর প্রতিযোগিতা এবং অব্যবস্থাপনা ও সবার অসচেতনতায় ফেরিঘাট যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। যার কারণে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার পেছনে স্থানীয় বিআইডব্লিউটিসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে।
নিয়ম অনুযায়ী, ঘাট পার হতে আসা যানবাহন পন্টুনে ওঠার আগের সড়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে। এরপর ঘাটে আসা ফেরি থেকে সব যানবাহন নেমে যাওয়ার পর অপেক্ষায় থাকা যানবাহনগুলো ফেরিতে উঠবে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, গত বুধবার বিকেলে হাসনা হেনা নামের ফেরিটি ঘাটে এসে পৌঁছাতেই সংযোগ সড়ক থেকে চলতে শুরু করে বাসটি, যা সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ে।
সরেজমিনে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট ঘুরে দেখা যায়, এত বড় দুর্ঘটনার পরও বাসগুলো নিয়ম না মেনে আগের মতোই প্রতিযোগিতা করে ফেরিতে উঠছে। ফেরিঘাটে না থাকলেও বাসসহ অন্যান্য যানবাহনগুলো সংযোগ সড়ক ও পন্টুনে দাঁড়িয়ে ফেরির জন্য অপেক্ষা করছে। বাস ভর্তি যাত্রী নিয়ে চলছে ওঠানামার কাজ। কিছু কিছু সচেতন যাত্রীরা ফেরিঘাটে এসে আতঙ্কে বাস থেকে নেমে গেলেও সিংহভাগ যাত্রীদের মাঝে নেই সচেতনতা। আবার চালকদের মাঝেও নেই কোনো সচেতনতার বালাই। তারাও প্রতিযোগিতা করে কে কার আগে ফেরিতে উঠবে সেই চেষ্টায় রয়েছে। এসব দেখভালের বিষয়ে উদাসীন ঘাট কর্তৃপক্ষ। এমনকি থেকে যাত্রীদের সচেতন করার জন্য কোনো মাইকিং করতেও দেখা যায়নি।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, দৌলতদিয়ায় ৭টি ফেরিঘাটের মধ্যে ১, ২, ৫ ও ৬নং ঘাট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। যানবাহন ও যাত্রী পারাপারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ৩, ৪ ও ৭নং ফেরিঘাট। ফেরি ঘাটে নদীর পানি কমে যাওয়ার কারণে সংযোগ সড়ক বেশি ঢালু ও খাড়া হয়ে পড়েছে। এ কারণে যানবাহনগুলোকে ফেরিতে উঠতে গিয়ে ও নামতে গিয়ে চরম বেগ পেতে হচ্ছে। ফলে প্রায়ই ভারী যানবাহনগুলো ফেরিতে উঠতে ও নামতে গিয়ে ঘটছে দুর্ঘটনা।
লঞ্চ ঘাটের অবস্থা আরও খারাপ। দীর্ঘদিন আগে লঞ্চঘাটে যাওয়ার পাটাতন ভেঙে পড়ে রয়েছে। নিচে বালুর বস্তা দিয়ে যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য কাঠের পাটাতন দেওয়া হয়েছে। সেটিও এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানেও ঘটতে পারে দুঘর্টনা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া দিয়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার যানবাহন পারাপার হয়। পদ্মার পানি কমে যাওয়ায় দৌলতদিয়া ঘাটের সবগুলো সংযোগ সড়ক স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ উঁচু হয়েছে। যে কারণে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট বড় দুর্ঘটনা-ধুলোবালিতে একাকার থাকছে পুরো ঘাট এলাকা।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ফেরিঘাটের সংযোগ সড়ক প্রায়ই মেরামত করা হয়। তবে সেটি স্থায়ী নয়, কিছু ইট, সুরকি ফেলে কোনো মতে চলাচল করার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু প্রতিবছরই ঘাটের সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য সব মেরামতের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়। সেই অর্থ যায় কাদের পকেটে বিষয়টি খতিয়ে দেখে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পরিবার নিয়ে রাজবাড়ী থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনে ঢাকায় যাচ্ছেন আহসান হাবীব। দৌলতদিয়া ৭নং ফেরিঘাটে এসে তিনি স্বপরিবারে বাস থেকে নেমে যান। এসময় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, কিছু আগে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গেল এ কারণে বাস থেকে নেমে গিয়েছি। প্রত্যেকটি যাত্রীর উচিত ঘাট এসে বাস থেকে নেমে গিয়ে বাস যখন ফেরিতে উঠবে তখন বাসে ওঠা। এই নিয়মটা সবার পালন করা উচিত। তা না হলে নিজেদের ভুলের কারণে বিপদগ্রস্ত হবে।
বাস কর্তৃপক্ষ নেমে যাওয়ার জন্য কিছু বলেছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাস থেকে নামার জন্য কেউ বলেনি। আমরা নিজ উদ্যোগে নেমেছি।
জেআর পরিবহনে মাকে নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন মোছা. শিউলি খাতুন। ৭নং ফেরিঘাটে এলাকায় দেখা যায় তিনি বাস থেকে নেমে পন্টুনে এসে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রয়েছে, তারপরও বলা যায় না যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে। এজন্য বাস থেকে নেমে দাঁড়িয়েছি। কয়েকদিন আগেই দেখলাম একটা বাস ব্রেক ফেল করে নদীতে পড়ে গেছে।
দর্শনা ডিলাক্স পরিবহনের যাত্রী ইয়াসমিন আরা বলেন, বাসের কর্তৃপক্ষ আমাদের নামার জন্য বলেছে, তাই নেমে এসেছি। কিন্তু আমাদের নিজেদেরও সচেতন হওয়ার দরকার আছে। কিন্তু আমরা নিজেরা যদি সতর্ক না হই তাহলে দেখা যায় ড্রাইভারের কারণে, সুপারভাইজারের কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিছু কিছু নতুন হেলপার যারা রয়েছে তারা গাড়ি চালানোর জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে, তাদের হাতে ড্রাইভাররা গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে।
ফেরিঘাটে ঢাকাগামী গোল্ডেন লাইন, রাজধানী এক্সপ্রেস, রয়েল এক্সপ্রেস, রাবেয়া পরিবহন, পূর্বাশাসহ একাধিক বাসের যাত্রীদের ঘাটে এসে বাস থেকে নামতে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে যাত্রীদের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, ঘাট এলাকায় প্রচুর ধুলাবালির কারণে তারা বাস থেকে নামছেন না।এছাড়া বাসে তাদের ব্যাগপত্র, মূল্যবান জিনিস রয়েছে। যে কারণে সেগুলোর নিরাপত্তার জন্য তারে বাসেই বসে রয়েছেন।
সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস ৭নং ফেরিঘাটে ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিল। এসময় বাসের যাত্রী ইয়াসমিন আক্তারের সঙ্গে কথা হয়। ঘাটে এসে বাস থেকে কেন নামলেন না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাচ্চাকাচ্চা ও সঙ্গে ব্যাগপত্র রয়েছে যে কারণে বাস থেকে নামিনি। এছাড়া ঘাটে প্রচুর ধুলাবালি। আমার শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে।
দর্শনা ডিলাক্সের যাত্রী শারমিন আক্তার লুবনা মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছিলেন ঢাকায়। ফেরিঘাটে এসে বাস থেকে না নামার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাসের কর্তৃপক্ষ আমাদের বাস থেকে নামার জন্য কোনো নির্দেশনা দেয়নি। যে কারণে বাস থেকে নামিনি।
অপর এক যাত্রী রবিন শেখ বলেন, ঘাটের যে দুর্দশা এর মধ্যে বাস থেকে না নামাই ভালো। ধুলাবালিতে জর্জরিত ঘাট এলাকা। বাস থেকে নেমে হেঁটে যে পন্টুনে দাঁড়াব ধুলাবালিতে শরীর ভরে যাবে।
যাত্রী নামিয়ে ঘাটে কেন উঠছে না এই প্রশ্নেরে উত্তরে দর্শনা ডিলাক্সের চালক সানি বলেন, কর্তৃপক্ষ আমাকে বাস থেকে যাত্রী নামাতে বলেনি, তাহলে কিভাবে আমরা যাত্রী নামিয়ে দিয়ে যাব। যাত্রীদের নামিয়ে দিলে ফেরিতে উঠতে গেলে তাদের অতিরিক্ত ৪০ টাকা দিতে হবে, কিন্তু তারা তো সেই টাকা দেবে না। বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ আমাকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
রাজধানী এক্সপ্রেসের চালক জাফর আলী ৭নং ফেরিঘাটে ফেরিতে উঠার জন্য সংযোগ সড়কে অপেক্ষা করছেন। বাস থেকে যাত্রীদের নেমে যাওয়ার জন্য কোনো নির্দেশনা দিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যাত্রীদের কয়েকবার বলা হয়েছে বাস থেকে নেমে যেতে, কিন্তু তারা নামছেন না। কারণ তাদের ব্যাগপত্র, মালছামান, বাচ্চাকাচ্চা, ছেলেমেয়ে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঘাটের অবস্থা ভয়াবহ, আমরা কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি না। এই যে সৌহার্দ্য গাড়ি পড়ে গেল কিসের জন্য, পন্টুনের দুই সাইডে কোনো রেলিং না থাকার কারণে। ফেরির পন্টুনে দুইপাশে ডালা থাকার কথা, কিন্তু নেই। আমরা যখন ঢাল থেকে নামি তখন যদি ব্রেক না ধরি সেসময় পন্টুনে যদি উঁচু কিছু থাকে সেখানে আটকে যাবে। কিন্তু ফেরির পন্টুনে এমন কিছু নেই। এটা আমাদের জন্য ঝুঁকি হয়ে যাচ্ছে। তাই আমরা চাচ্ছি ফেরির পন্টুনের দুপাশে রেলিং দিয়ে দেওয়া হোক এবং ঢাল জায়গায় মাটি দিয়ে উঁচু করে দেওয়া হোক।
৭নং ফেরিঘাট দায়িত্বরত বিআইডব্লিউটিসির ফেরিঘাটের টিএস মো.আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে প্রত্যেকটি বাসকে বলে দিচ্ছি যাত্রী নামানোর জন্য। সেক্ষেত্রে কিছু যাত্রী নামছে, কিছু যাত্রী নামছে না।মহিলা যারা রয়েছেন তারা নামতে চান না সাধারণত।
ঘাটের সংযোগ সড়ক ও পন্টুনের এমন নাজুক অবস্থার বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ আরিচা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শেরে মসতানকে প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যান। তার ফোনে কল আসছে বলে তিনি দ্রুত সরে যান।
দৌলতদিয়া ৩নং ফেরিঘাটে পাওয়া যায় বিআইডব্লিউটিএ আরিচা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল আলমকে। তার কাছে সংযোগ সড়ক ও পন্টুনের সংস্কার বা উন্নয়ন কেন করা হয় না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা নদী ভাঙন কবলিত এলাকা। প্রতি বছরই ভাঙনের সম্ভবনা থাকে। তাই আমরা চাইলেও স্থায়ীভাবে পাকা করে করার সুযোগ নেই। আমাদের নদীর পানি যখন বাড়ে এবং যখন কমে তখন ঘাটগুলোকে পানির সঙ্গে সমন্বয় করে উঠাতে হয় এবং নামাতে হয়। আমাদের ঘাটের ঢালে কোনো সমস্যা নেই, এ কারণে গাড়ি উঠানামা করতেও সমস্যা নেই।
ঘাট সংস্কার বা উন্নয়ন করতে প্রতি বছর রাষ্ট্রের কয়েক কোটি টাকা খরচ হচ্ছে তারপরও ঘাটের উন্নয়ন নেই কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দৌলতদিয়ায় ৩টি রানিং ফেরিঘাট। একটা ঘাটে তিনটি করে স্টেজ- লো, মিড ও হাই। তার মানে ৯টা ঘাটকে সারাবছর সংরক্ষণ ও মেরামত করার জন্য বাৎসরিকভাবে ঠিকাদার নিয়োগ করা আছে। এই ঘাট মেরামতের জন্য সারাবছর ৫০ লাখ টাকা বাজেট দেওয়া আছে। এই টাকা খুবই সামান্য বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ১৯৬৩ সালের ৩১ মার্চ থেকে দৌলতদিয়া-আরিচা ফেরি সার্ভিস চালু হয়। সেই ১৯৬৩ সাল থেকে বিআইডব্লিউটিএ সার্বক্ষণিক ফেরি সার্ভিস সচল রাখার জন্য এ ঘাটে বিভিন্ন কার্যক্রম করে সেবা দিয়ে আসছে।
ফেরি ঘাটে কোনো সমস্যা নেই দাবি করে এই কর্মকর্তা বলেন, আমাদের ফেরিঘাটের স্লপ যথেষ্ট ভালো আছে এবং সব গাড়ি উঠছে। শুধুমাত্র সেসব গাড়ি উঠতে পারে না যেসব গাড়ির ফিটনেস নেই, পাশাপাশি যেসব গাড়ি ওভারলোড নিয়ে আসে। ওভারলোড গাড়িগুলোর জন্য আমাদের ফেরিঘাটের এ্যাপ্রোচ সড়ক, জাতীয় মহাসড়ক ও ফেরিতেও সমস্যা হচ্ছে। এগুলোকে আমাদের বন্ধ করা উচিত। এই ওভারলোড গাড়িগুলোর জন্যেই দুর্ঘটনা ঘটছে।
বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সহকারী মহা ব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, আমরা বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে যাত্রীদের সবসময় অনুরোধ করি বাস থেকে নেমে যাওয়ার জন্য এবং বাস চালকদের অনুরোধ করি খালি গাড়ি ফেরিতে উঠানোর জন্য। এমনকি আমাদের টিকিটের পিছনেও এমন নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। দুর্ঘটনা কবলিত ঘাটটিও আমাদের বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান পরিদর্শন করেছেন। তিনিও যাত্রীদের বাস থেকে নেমে ফেরিতে ওঠার নির্দেশনা দিয়েছেন।
বাস ডুবে যাওয়ার ঘটনায় বিআইডব্লিউটিসির কোনো গাফিলতি ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৩নং ফেরিঘাটে অপেক্ষমান থাকা সৌহার্দ্য পরিবহনের বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ব্রেক ফেল হয়ে নদীতে পড়ে যায়। এই বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। তবে এ ঘটনায় বিআইডব্লিউটিসির কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দায় বা গাফিলতি নেই। এ বিষয়ে সরকারের দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে তদন্ত কমিটির আমি একজন সদস্য। তদন্ত কাজে আমি সার্বিক সহযোগিতা করছি।
পন্টুন ব্যবস্থাপনায় কোনো দুর্বলতা ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, পন্টুন ব্যবস্থাপনাটি আমাদের নৌ বিভাগের কর্মকর্তারা দেখেন। নৌবিদ্যা রিলেটেড যাদের পড়াশোনা আছে এবং আমাদের মেরিন বিভাগের সংশ্লিষ্ট যারা এক্সপার্ট রয়েছেন তারা এ বিষয়টি দেখেন। পন্টুনের বিষয়টি আমাদের নৌ বিভাগের এক্সপার্টরা বলতে পারবে।
বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ দৌলতদিয়া ঘাট পরিদর্শনে এসে বলেন, পন্টুনগুলোতে নিরাপত্তার স্বার্থে রেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে, যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। যারা ফেরি ও ঘাট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত, তাদের আধুনিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে ঘাটের জরাজীর্ণতা দূর করতে দ্রুত সমাধানের কথাও জানান তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, সাধারণত গাড়িগুলো পন্টুনে আসার আগে থামে। এরপর সুবিধামতো ফেরিতে উঠে পড়ে। কিন্তু দুর্ঘটনার সময় দেখা গেছে, হাসনা হেনা ফেরিটি প্রস্তুত ছিল না, তার আগেই চালকের ভুলে গাড়িটি পন্টুনে এসেছে। নিয়ম হলো- ফেরিতে থাকা গাড়িগুলো আগে নামবে, এরপর নতুন করে যানবাহন উঠবে।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, সরকার এরই মধ্যে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে ঘাট ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ণে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বলেন, নিহতদের দাফনের জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়েও সরকার কাজ করবে।
তবে এই দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানির নয় বরং ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, নিরাপত্তা ঘাটতি এবং দায়িত্বহীনতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। স্বজন হারানোর বেদনা আর প্রশাসনিক জবাবদিহির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট।

ঈদের ছুটি শেষে যখন ঢাকায় ফিরছিলেন তারা, ঠিক তখনই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় থমকে যায় বহু প্রাণ। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবির ঘটনায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন। ফেরিঘাটের অব্যস্থাপনা, বাস চালকের অদক্ষতা নাকি ঘাটে ওঠার সময় বাসের ভেতর বসে থাকা যাত্রীদের অসচেতনতা- কোনটি দায়ী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও সচেতনতার ঘাটতি রয়েই গেছে। যাত্রীরা দোষারোপ করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টদের, এদিকে নিয়ম না মেনেই আগের মতোই ফেরিতে উঠছে বাসগুলো। সরেজমিনে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় গিয়ে এসব চিত্রই চোখে পড়ে।
রেলিংবিহীন অরক্ষিত পন্টুন, ঢালু ও খানাখন্দে ভরা সংযোগ সড়ক, ফেরিতে আগে উঠতে যানবাহনগুলোর প্রতিযোগিতা এবং অব্যবস্থাপনা ও সবার অসচেতনতায় ফেরিঘাট যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। যার কারণে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার পেছনে স্থানীয় বিআইডব্লিউটিসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে।
নিয়ম অনুযায়ী, ঘাট পার হতে আসা যানবাহন পন্টুনে ওঠার আগের সড়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে। এরপর ঘাটে আসা ফেরি থেকে সব যানবাহন নেমে যাওয়ার পর অপেক্ষায় থাকা যানবাহনগুলো ফেরিতে উঠবে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, গত বুধবার বিকেলে হাসনা হেনা নামের ফেরিটি ঘাটে এসে পৌঁছাতেই সংযোগ সড়ক থেকে চলতে শুরু করে বাসটি, যা সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ে।
সরেজমিনে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট ঘুরে দেখা যায়, এত বড় দুর্ঘটনার পরও বাসগুলো নিয়ম না মেনে আগের মতোই প্রতিযোগিতা করে ফেরিতে উঠছে। ফেরিঘাটে না থাকলেও বাসসহ অন্যান্য যানবাহনগুলো সংযোগ সড়ক ও পন্টুনে দাঁড়িয়ে ফেরির জন্য অপেক্ষা করছে। বাস ভর্তি যাত্রী নিয়ে চলছে ওঠানামার কাজ। কিছু কিছু সচেতন যাত্রীরা ফেরিঘাটে এসে আতঙ্কে বাস থেকে নেমে গেলেও সিংহভাগ যাত্রীদের মাঝে নেই সচেতনতা। আবার চালকদের মাঝেও নেই কোনো সচেতনতার বালাই। তারাও প্রতিযোগিতা করে কে কার আগে ফেরিতে উঠবে সেই চেষ্টায় রয়েছে। এসব দেখভালের বিষয়ে উদাসীন ঘাট কর্তৃপক্ষ। এমনকি থেকে যাত্রীদের সচেতন করার জন্য কোনো মাইকিং করতেও দেখা যায়নি।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, দৌলতদিয়ায় ৭টি ফেরিঘাটের মধ্যে ১, ২, ৫ ও ৬নং ঘাট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। যানবাহন ও যাত্রী পারাপারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ৩, ৪ ও ৭নং ফেরিঘাট। ফেরি ঘাটে নদীর পানি কমে যাওয়ার কারণে সংযোগ সড়ক বেশি ঢালু ও খাড়া হয়ে পড়েছে। এ কারণে যানবাহনগুলোকে ফেরিতে উঠতে গিয়ে ও নামতে গিয়ে চরম বেগ পেতে হচ্ছে। ফলে প্রায়ই ভারী যানবাহনগুলো ফেরিতে উঠতে ও নামতে গিয়ে ঘটছে দুর্ঘটনা।
লঞ্চ ঘাটের অবস্থা আরও খারাপ। দীর্ঘদিন আগে লঞ্চঘাটে যাওয়ার পাটাতন ভেঙে পড়ে রয়েছে। নিচে বালুর বস্তা দিয়ে যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য কাঠের পাটাতন দেওয়া হয়েছে। সেটিও এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানেও ঘটতে পারে দুঘর্টনা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া দিয়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার যানবাহন পারাপার হয়। পদ্মার পানি কমে যাওয়ায় দৌলতদিয়া ঘাটের সবগুলো সংযোগ সড়ক স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ উঁচু হয়েছে। যে কারণে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট বড় দুর্ঘটনা-ধুলোবালিতে একাকার থাকছে পুরো ঘাট এলাকা।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ফেরিঘাটের সংযোগ সড়ক প্রায়ই মেরামত করা হয়। তবে সেটি স্থায়ী নয়, কিছু ইট, সুরকি ফেলে কোনো মতে চলাচল করার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু প্রতিবছরই ঘাটের সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য সব মেরামতের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়। সেই অর্থ যায় কাদের পকেটে বিষয়টি খতিয়ে দেখে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পরিবার নিয়ে রাজবাড়ী থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনে ঢাকায় যাচ্ছেন আহসান হাবীব। দৌলতদিয়া ৭নং ফেরিঘাটে এসে তিনি স্বপরিবারে বাস থেকে নেমে যান। এসময় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, কিছু আগে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গেল এ কারণে বাস থেকে নেমে গিয়েছি। প্রত্যেকটি যাত্রীর উচিত ঘাট এসে বাস থেকে নেমে গিয়ে বাস যখন ফেরিতে উঠবে তখন বাসে ওঠা। এই নিয়মটা সবার পালন করা উচিত। তা না হলে নিজেদের ভুলের কারণে বিপদগ্রস্ত হবে।
বাস কর্তৃপক্ষ নেমে যাওয়ার জন্য কিছু বলেছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাস থেকে নামার জন্য কেউ বলেনি। আমরা নিজ উদ্যোগে নেমেছি।
জেআর পরিবহনে মাকে নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন মোছা. শিউলি খাতুন। ৭নং ফেরিঘাটে এলাকায় দেখা যায় তিনি বাস থেকে নেমে পন্টুনে এসে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রয়েছে, তারপরও বলা যায় না যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে। এজন্য বাস থেকে নেমে দাঁড়িয়েছি। কয়েকদিন আগেই দেখলাম একটা বাস ব্রেক ফেল করে নদীতে পড়ে গেছে।
দর্শনা ডিলাক্স পরিবহনের যাত্রী ইয়াসমিন আরা বলেন, বাসের কর্তৃপক্ষ আমাদের নামার জন্য বলেছে, তাই নেমে এসেছি। কিন্তু আমাদের নিজেদেরও সচেতন হওয়ার দরকার আছে। কিন্তু আমরা নিজেরা যদি সতর্ক না হই তাহলে দেখা যায় ড্রাইভারের কারণে, সুপারভাইজারের কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিছু কিছু নতুন হেলপার যারা রয়েছে তারা গাড়ি চালানোর জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে, তাদের হাতে ড্রাইভাররা গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে।
ফেরিঘাটে ঢাকাগামী গোল্ডেন লাইন, রাজধানী এক্সপ্রেস, রয়েল এক্সপ্রেস, রাবেয়া পরিবহন, পূর্বাশাসহ একাধিক বাসের যাত্রীদের ঘাটে এসে বাস থেকে নামতে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে যাত্রীদের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, ঘাট এলাকায় প্রচুর ধুলাবালির কারণে তারা বাস থেকে নামছেন না।এছাড়া বাসে তাদের ব্যাগপত্র, মূল্যবান জিনিস রয়েছে। যে কারণে সেগুলোর নিরাপত্তার জন্য তারে বাসেই বসে রয়েছেন।
সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস ৭নং ফেরিঘাটে ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিল। এসময় বাসের যাত্রী ইয়াসমিন আক্তারের সঙ্গে কথা হয়। ঘাটে এসে বাস থেকে কেন নামলেন না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাচ্চাকাচ্চা ও সঙ্গে ব্যাগপত্র রয়েছে যে কারণে বাস থেকে নামিনি। এছাড়া ঘাটে প্রচুর ধুলাবালি। আমার শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে।
দর্শনা ডিলাক্সের যাত্রী শারমিন আক্তার লুবনা মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছিলেন ঢাকায়। ফেরিঘাটে এসে বাস থেকে না নামার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাসের কর্তৃপক্ষ আমাদের বাস থেকে নামার জন্য কোনো নির্দেশনা দেয়নি। যে কারণে বাস থেকে নামিনি।
অপর এক যাত্রী রবিন শেখ বলেন, ঘাটের যে দুর্দশা এর মধ্যে বাস থেকে না নামাই ভালো। ধুলাবালিতে জর্জরিত ঘাট এলাকা। বাস থেকে নেমে হেঁটে যে পন্টুনে দাঁড়াব ধুলাবালিতে শরীর ভরে যাবে।
যাত্রী নামিয়ে ঘাটে কেন উঠছে না এই প্রশ্নেরে উত্তরে দর্শনা ডিলাক্সের চালক সানি বলেন, কর্তৃপক্ষ আমাকে বাস থেকে যাত্রী নামাতে বলেনি, তাহলে কিভাবে আমরা যাত্রী নামিয়ে দিয়ে যাব। যাত্রীদের নামিয়ে দিলে ফেরিতে উঠতে গেলে তাদের অতিরিক্ত ৪০ টাকা দিতে হবে, কিন্তু তারা তো সেই টাকা দেবে না। বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ আমাকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
রাজধানী এক্সপ্রেসের চালক জাফর আলী ৭নং ফেরিঘাটে ফেরিতে উঠার জন্য সংযোগ সড়কে অপেক্ষা করছেন। বাস থেকে যাত্রীদের নেমে যাওয়ার জন্য কোনো নির্দেশনা দিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যাত্রীদের কয়েকবার বলা হয়েছে বাস থেকে নেমে যেতে, কিন্তু তারা নামছেন না। কারণ তাদের ব্যাগপত্র, মালছামান, বাচ্চাকাচ্চা, ছেলেমেয়ে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঘাটের অবস্থা ভয়াবহ, আমরা কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি না। এই যে সৌহার্দ্য গাড়ি পড়ে গেল কিসের জন্য, পন্টুনের দুই সাইডে কোনো রেলিং না থাকার কারণে। ফেরির পন্টুনে দুইপাশে ডালা থাকার কথা, কিন্তু নেই। আমরা যখন ঢাল থেকে নামি তখন যদি ব্রেক না ধরি সেসময় পন্টুনে যদি উঁচু কিছু থাকে সেখানে আটকে যাবে। কিন্তু ফেরির পন্টুনে এমন কিছু নেই। এটা আমাদের জন্য ঝুঁকি হয়ে যাচ্ছে। তাই আমরা চাচ্ছি ফেরির পন্টুনের দুপাশে রেলিং দিয়ে দেওয়া হোক এবং ঢাল জায়গায় মাটি দিয়ে উঁচু করে দেওয়া হোক।
৭নং ফেরিঘাট দায়িত্বরত বিআইডব্লিউটিসির ফেরিঘাটের টিএস মো.আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে প্রত্যেকটি বাসকে বলে দিচ্ছি যাত্রী নামানোর জন্য। সেক্ষেত্রে কিছু যাত্রী নামছে, কিছু যাত্রী নামছে না।মহিলা যারা রয়েছেন তারা নামতে চান না সাধারণত।
ঘাটের সংযোগ সড়ক ও পন্টুনের এমন নাজুক অবস্থার বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ আরিচা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শেরে মসতানকে প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যান। তার ফোনে কল আসছে বলে তিনি দ্রুত সরে যান।
দৌলতদিয়া ৩নং ফেরিঘাটে পাওয়া যায় বিআইডব্লিউটিএ আরিচা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল আলমকে। তার কাছে সংযোগ সড়ক ও পন্টুনের সংস্কার বা উন্নয়ন কেন করা হয় না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা নদী ভাঙন কবলিত এলাকা। প্রতি বছরই ভাঙনের সম্ভবনা থাকে। তাই আমরা চাইলেও স্থায়ীভাবে পাকা করে করার সুযোগ নেই। আমাদের নদীর পানি যখন বাড়ে এবং যখন কমে তখন ঘাটগুলোকে পানির সঙ্গে সমন্বয় করে উঠাতে হয় এবং নামাতে হয়। আমাদের ঘাটের ঢালে কোনো সমস্যা নেই, এ কারণে গাড়ি উঠানামা করতেও সমস্যা নেই।
ঘাট সংস্কার বা উন্নয়ন করতে প্রতি বছর রাষ্ট্রের কয়েক কোটি টাকা খরচ হচ্ছে তারপরও ঘাটের উন্নয়ন নেই কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দৌলতদিয়ায় ৩টি রানিং ফেরিঘাট। একটা ঘাটে তিনটি করে স্টেজ- লো, মিড ও হাই। তার মানে ৯টা ঘাটকে সারাবছর সংরক্ষণ ও মেরামত করার জন্য বাৎসরিকভাবে ঠিকাদার নিয়োগ করা আছে। এই ঘাট মেরামতের জন্য সারাবছর ৫০ লাখ টাকা বাজেট দেওয়া আছে। এই টাকা খুবই সামান্য বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ১৯৬৩ সালের ৩১ মার্চ থেকে দৌলতদিয়া-আরিচা ফেরি সার্ভিস চালু হয়। সেই ১৯৬৩ সাল থেকে বিআইডব্লিউটিএ সার্বক্ষণিক ফেরি সার্ভিস সচল রাখার জন্য এ ঘাটে বিভিন্ন কার্যক্রম করে সেবা দিয়ে আসছে।
ফেরি ঘাটে কোনো সমস্যা নেই দাবি করে এই কর্মকর্তা বলেন, আমাদের ফেরিঘাটের স্লপ যথেষ্ট ভালো আছে এবং সব গাড়ি উঠছে। শুধুমাত্র সেসব গাড়ি উঠতে পারে না যেসব গাড়ির ফিটনেস নেই, পাশাপাশি যেসব গাড়ি ওভারলোড নিয়ে আসে। ওভারলোড গাড়িগুলোর জন্য আমাদের ফেরিঘাটের এ্যাপ্রোচ সড়ক, জাতীয় মহাসড়ক ও ফেরিতেও সমস্যা হচ্ছে। এগুলোকে আমাদের বন্ধ করা উচিত। এই ওভারলোড গাড়িগুলোর জন্যেই দুর্ঘটনা ঘটছে।
বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সহকারী মহা ব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, আমরা বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে যাত্রীদের সবসময় অনুরোধ করি বাস থেকে নেমে যাওয়ার জন্য এবং বাস চালকদের অনুরোধ করি খালি গাড়ি ফেরিতে উঠানোর জন্য। এমনকি আমাদের টিকিটের পিছনেও এমন নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। দুর্ঘটনা কবলিত ঘাটটিও আমাদের বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান পরিদর্শন করেছেন। তিনিও যাত্রীদের বাস থেকে নেমে ফেরিতে ওঠার নির্দেশনা দিয়েছেন।
বাস ডুবে যাওয়ার ঘটনায় বিআইডব্লিউটিসির কোনো গাফিলতি ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৩নং ফেরিঘাটে অপেক্ষমান থাকা সৌহার্দ্য পরিবহনের বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ব্রেক ফেল হয়ে নদীতে পড়ে যায়। এই বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। তবে এ ঘটনায় বিআইডব্লিউটিসির কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দায় বা গাফিলতি নেই। এ বিষয়ে সরকারের দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে তদন্ত কমিটির আমি একজন সদস্য। তদন্ত কাজে আমি সার্বিক সহযোগিতা করছি।
পন্টুন ব্যবস্থাপনায় কোনো দুর্বলতা ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, পন্টুন ব্যবস্থাপনাটি আমাদের নৌ বিভাগের কর্মকর্তারা দেখেন। নৌবিদ্যা রিলেটেড যাদের পড়াশোনা আছে এবং আমাদের মেরিন বিভাগের সংশ্লিষ্ট যারা এক্সপার্ট রয়েছেন তারা এ বিষয়টি দেখেন। পন্টুনের বিষয়টি আমাদের নৌ বিভাগের এক্সপার্টরা বলতে পারবে।
বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ দৌলতদিয়া ঘাট পরিদর্শনে এসে বলেন, পন্টুনগুলোতে নিরাপত্তার স্বার্থে রেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে, যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। যারা ফেরি ও ঘাট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত, তাদের আধুনিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে ঘাটের জরাজীর্ণতা দূর করতে দ্রুত সমাধানের কথাও জানান তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, সাধারণত গাড়িগুলো পন্টুনে আসার আগে থামে। এরপর সুবিধামতো ফেরিতে উঠে পড়ে। কিন্তু দুর্ঘটনার সময় দেখা গেছে, হাসনা হেনা ফেরিটি প্রস্তুত ছিল না, তার আগেই চালকের ভুলে গাড়িটি পন্টুনে এসেছে। নিয়ম হলো- ফেরিতে থাকা গাড়িগুলো আগে নামবে, এরপর নতুন করে যানবাহন উঠবে।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, সরকার এরই মধ্যে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে ঘাট ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ণে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বলেন, নিহতদের দাফনের জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়েও সরকার কাজ করবে।
তবে এই দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানির নয় বরং ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, নিরাপত্তা ঘাটতি এবং দায়িত্বহীনতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। স্বজন হারানোর বেদনা আর প্রশাসনিক জবাবদিহির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট।

ঈদের ছুটি শেষে যখন ঢাকায় ফিরছিলেন তারা, ঠিক তখনই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় থমকে যায় বহু প্রাণ। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবির ঘটনায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন। ফেরিঘাটের অব্যস্থাপনা, বাস চালকের অদক্ষতা নাকি ঘাটে ওঠার সময় বাসের ভেতর বসে থাকা যাত্রীদের অসচেতনতা- কোনটি দায়ী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও সচেতনতার ঘাটতি রয়েই গেছে। যাত্রীরা দোষারোপ করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টদের, এদিকে নিয়ম না মেনেই আগের মতোই ফেরিতে উঠছে বাসগুলো। সরেজমিনে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় গিয়ে এসব চিত্রই চোখে পড়ে।
রেলিংবিহীন অরক্ষিত পন্টুন, ঢালু ও খানাখন্দে ভরা সংযোগ সড়ক, ফেরিতে আগে উঠতে যানবাহনগুলোর প্রতিযোগিতা এবং অব্যবস্থাপনা ও সবার অসচেতনতায় ফেরিঘাট যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। যার কারণে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার পেছনে স্থানীয় বিআইডব্লিউটিসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে।
নিয়ম অনুযায়ী, ঘাট পার হতে আসা যানবাহন পন্টুনে ওঠার আগের সড়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে। এরপর ঘাটে আসা ফেরি থেকে সব যানবাহন নেমে যাওয়ার পর অপেক্ষায় থাকা যানবাহনগুলো ফেরিতে উঠবে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, গত বুধবার বিকেলে হাসনা হেনা নামের ফেরিটি ঘাটে এসে পৌঁছাতেই সংযোগ সড়ক থেকে চলতে শুরু করে বাসটি, যা সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ে।
সরেজমিনে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট ঘুরে দেখা যায়, এত বড় দুর্ঘটনার পরও বাসগুলো নিয়ম না মেনে আগের মতোই প্রতিযোগিতা করে ফেরিতে উঠছে। ফেরিঘাটে না থাকলেও বাসসহ অন্যান্য যানবাহনগুলো সংযোগ সড়ক ও পন্টুনে দাঁড়িয়ে ফেরির জন্য অপেক্ষা করছে। বাস ভর্তি যাত্রী নিয়ে চলছে ওঠানামার কাজ। কিছু কিছু সচেতন যাত্রীরা ফেরিঘাটে এসে আতঙ্কে বাস থেকে নেমে গেলেও সিংহভাগ যাত্রীদের মাঝে নেই সচেতনতা। আবার চালকদের মাঝেও নেই কোনো সচেতনতার বালাই। তারাও প্রতিযোগিতা করে কে কার আগে ফেরিতে উঠবে সেই চেষ্টায় রয়েছে। এসব দেখভালের বিষয়ে উদাসীন ঘাট কর্তৃপক্ষ। এমনকি থেকে যাত্রীদের সচেতন করার জন্য কোনো মাইকিং করতেও দেখা যায়নি।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, দৌলতদিয়ায় ৭টি ফেরিঘাটের মধ্যে ১, ২, ৫ ও ৬নং ঘাট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। যানবাহন ও যাত্রী পারাপারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ৩, ৪ ও ৭নং ফেরিঘাট। ফেরি ঘাটে নদীর পানি কমে যাওয়ার কারণে সংযোগ সড়ক বেশি ঢালু ও খাড়া হয়ে পড়েছে। এ কারণে যানবাহনগুলোকে ফেরিতে উঠতে গিয়ে ও নামতে গিয়ে চরম বেগ পেতে হচ্ছে। ফলে প্রায়ই ভারী যানবাহনগুলো ফেরিতে উঠতে ও নামতে গিয়ে ঘটছে দুর্ঘটনা।
লঞ্চ ঘাটের অবস্থা আরও খারাপ। দীর্ঘদিন আগে লঞ্চঘাটে যাওয়ার পাটাতন ভেঙে পড়ে রয়েছে। নিচে বালুর বস্তা দিয়ে যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য কাঠের পাটাতন দেওয়া হয়েছে। সেটিও এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানেও ঘটতে পারে দুঘর্টনা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া দিয়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার যানবাহন পারাপার হয়। পদ্মার পানি কমে যাওয়ায় দৌলতদিয়া ঘাটের সবগুলো সংযোগ সড়ক স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ উঁচু হয়েছে। যে কারণে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট বড় দুর্ঘটনা-ধুলোবালিতে একাকার থাকছে পুরো ঘাট এলাকা।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ফেরিঘাটের সংযোগ সড়ক প্রায়ই মেরামত করা হয়। তবে সেটি স্থায়ী নয়, কিছু ইট, সুরকি ফেলে কোনো মতে চলাচল করার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু প্রতিবছরই ঘাটের সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য সব মেরামতের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়। সেই অর্থ যায় কাদের পকেটে বিষয়টি খতিয়ে দেখে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পরিবার নিয়ে রাজবাড়ী থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনে ঢাকায় যাচ্ছেন আহসান হাবীব। দৌলতদিয়া ৭নং ফেরিঘাটে এসে তিনি স্বপরিবারে বাস থেকে নেমে যান। এসময় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, কিছু আগে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গেল এ কারণে বাস থেকে নেমে গিয়েছি। প্রত্যেকটি যাত্রীর উচিত ঘাট এসে বাস থেকে নেমে গিয়ে বাস যখন ফেরিতে উঠবে তখন বাসে ওঠা। এই নিয়মটা সবার পালন করা উচিত। তা না হলে নিজেদের ভুলের কারণে বিপদগ্রস্ত হবে।
বাস কর্তৃপক্ষ নেমে যাওয়ার জন্য কিছু বলেছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাস থেকে নামার জন্য কেউ বলেনি। আমরা নিজ উদ্যোগে নেমেছি।
জেআর পরিবহনে মাকে নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছেন মোছা. শিউলি খাতুন। ৭নং ফেরিঘাটে এলাকায় দেখা যায় তিনি বাস থেকে নেমে পন্টুনে এসে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রয়েছে, তারপরও বলা যায় না যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে। এজন্য বাস থেকে নেমে দাঁড়িয়েছি। কয়েকদিন আগেই দেখলাম একটা বাস ব্রেক ফেল করে নদীতে পড়ে গেছে।
দর্শনা ডিলাক্স পরিবহনের যাত্রী ইয়াসমিন আরা বলেন, বাসের কর্তৃপক্ষ আমাদের নামার জন্য বলেছে, তাই নেমে এসেছি। কিন্তু আমাদের নিজেদেরও সচেতন হওয়ার দরকার আছে। কিন্তু আমরা নিজেরা যদি সতর্ক না হই তাহলে দেখা যায় ড্রাইভারের কারণে, সুপারভাইজারের কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিছু কিছু নতুন হেলপার যারা রয়েছে তারা গাড়ি চালানোর জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে, তাদের হাতে ড্রাইভাররা গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে।
ফেরিঘাটে ঢাকাগামী গোল্ডেন লাইন, রাজধানী এক্সপ্রেস, রয়েল এক্সপ্রেস, রাবেয়া পরিবহন, পূর্বাশাসহ একাধিক বাসের যাত্রীদের ঘাটে এসে বাস থেকে নামতে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে যাত্রীদের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, ঘাট এলাকায় প্রচুর ধুলাবালির কারণে তারা বাস থেকে নামছেন না।এছাড়া বাসে তাদের ব্যাগপত্র, মূল্যবান জিনিস রয়েছে। যে কারণে সেগুলোর নিরাপত্তার জন্য তারে বাসেই বসে রয়েছেন।
সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস ৭নং ফেরিঘাটে ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিল। এসময় বাসের যাত্রী ইয়াসমিন আক্তারের সঙ্গে কথা হয়। ঘাটে এসে বাস থেকে কেন নামলেন না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাচ্চাকাচ্চা ও সঙ্গে ব্যাগপত্র রয়েছে যে কারণে বাস থেকে নামিনি। এছাড়া ঘাটে প্রচুর ধুলাবালি। আমার শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে।
দর্শনা ডিলাক্সের যাত্রী শারমিন আক্তার লুবনা মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছিলেন ঢাকায়। ফেরিঘাটে এসে বাস থেকে না নামার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাসের কর্তৃপক্ষ আমাদের বাস থেকে নামার জন্য কোনো নির্দেশনা দেয়নি। যে কারণে বাস থেকে নামিনি।
অপর এক যাত্রী রবিন শেখ বলেন, ঘাটের যে দুর্দশা এর মধ্যে বাস থেকে না নামাই ভালো। ধুলাবালিতে জর্জরিত ঘাট এলাকা। বাস থেকে নেমে হেঁটে যে পন্টুনে দাঁড়াব ধুলাবালিতে শরীর ভরে যাবে।
যাত্রী নামিয়ে ঘাটে কেন উঠছে না এই প্রশ্নেরে উত্তরে দর্শনা ডিলাক্সের চালক সানি বলেন, কর্তৃপক্ষ আমাকে বাস থেকে যাত্রী নামাতে বলেনি, তাহলে কিভাবে আমরা যাত্রী নামিয়ে দিয়ে যাব। যাত্রীদের নামিয়ে দিলে ফেরিতে উঠতে গেলে তাদের অতিরিক্ত ৪০ টাকা দিতে হবে, কিন্তু তারা তো সেই টাকা দেবে না। বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ আমাকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
রাজধানী এক্সপ্রেসের চালক জাফর আলী ৭নং ফেরিঘাটে ফেরিতে উঠার জন্য সংযোগ সড়কে অপেক্ষা করছেন। বাস থেকে যাত্রীদের নেমে যাওয়ার জন্য কোনো নির্দেশনা দিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যাত্রীদের কয়েকবার বলা হয়েছে বাস থেকে নেমে যেতে, কিন্তু তারা নামছেন না। কারণ তাদের ব্যাগপত্র, মালছামান, বাচ্চাকাচ্চা, ছেলেমেয়ে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঘাটের অবস্থা ভয়াবহ, আমরা কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি না। এই যে সৌহার্দ্য গাড়ি পড়ে গেল কিসের জন্য, পন্টুনের দুই সাইডে কোনো রেলিং না থাকার কারণে। ফেরির পন্টুনে দুইপাশে ডালা থাকার কথা, কিন্তু নেই। আমরা যখন ঢাল থেকে নামি তখন যদি ব্রেক না ধরি সেসময় পন্টুনে যদি উঁচু কিছু থাকে সেখানে আটকে যাবে। কিন্তু ফেরির পন্টুনে এমন কিছু নেই। এটা আমাদের জন্য ঝুঁকি হয়ে যাচ্ছে। তাই আমরা চাচ্ছি ফেরির পন্টুনের দুপাশে রেলিং দিয়ে দেওয়া হোক এবং ঢাল জায়গায় মাটি দিয়ে উঁচু করে দেওয়া হোক।
৭নং ফেরিঘাট দায়িত্বরত বিআইডব্লিউটিসির ফেরিঘাটের টিএস মো.আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে প্রত্যেকটি বাসকে বলে দিচ্ছি যাত্রী নামানোর জন্য। সেক্ষেত্রে কিছু যাত্রী নামছে, কিছু যাত্রী নামছে না।মহিলা যারা রয়েছেন তারা নামতে চান না সাধারণত।
ঘাটের সংযোগ সড়ক ও পন্টুনের এমন নাজুক অবস্থার বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ আরিচা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শেরে মসতানকে প্রশ্ন করলে তিনি এড়িয়ে যান। তার ফোনে কল আসছে বলে তিনি দ্রুত সরে যান।
দৌলতদিয়া ৩নং ফেরিঘাটে পাওয়া যায় বিআইডব্লিউটিএ আরিচা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল আলমকে। তার কাছে সংযোগ সড়ক ও পন্টুনের সংস্কার বা উন্নয়ন কেন করা হয় না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা নদী ভাঙন কবলিত এলাকা। প্রতি বছরই ভাঙনের সম্ভবনা থাকে। তাই আমরা চাইলেও স্থায়ীভাবে পাকা করে করার সুযোগ নেই। আমাদের নদীর পানি যখন বাড়ে এবং যখন কমে তখন ঘাটগুলোকে পানির সঙ্গে সমন্বয় করে উঠাতে হয় এবং নামাতে হয়। আমাদের ঘাটের ঢালে কোনো সমস্যা নেই, এ কারণে গাড়ি উঠানামা করতেও সমস্যা নেই।
ঘাট সংস্কার বা উন্নয়ন করতে প্রতি বছর রাষ্ট্রের কয়েক কোটি টাকা খরচ হচ্ছে তারপরও ঘাটের উন্নয়ন নেই কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দৌলতদিয়ায় ৩টি রানিং ফেরিঘাট। একটা ঘাটে তিনটি করে স্টেজ- লো, মিড ও হাই। তার মানে ৯টা ঘাটকে সারাবছর সংরক্ষণ ও মেরামত করার জন্য বাৎসরিকভাবে ঠিকাদার নিয়োগ করা আছে। এই ঘাট মেরামতের জন্য সারাবছর ৫০ লাখ টাকা বাজেট দেওয়া আছে। এই টাকা খুবই সামান্য বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ১৯৬৩ সালের ৩১ মার্চ থেকে দৌলতদিয়া-আরিচা ফেরি সার্ভিস চালু হয়। সেই ১৯৬৩ সাল থেকে বিআইডব্লিউটিএ সার্বক্ষণিক ফেরি সার্ভিস সচল রাখার জন্য এ ঘাটে বিভিন্ন কার্যক্রম করে সেবা দিয়ে আসছে।
ফেরি ঘাটে কোনো সমস্যা নেই দাবি করে এই কর্মকর্তা বলেন, আমাদের ফেরিঘাটের স্লপ যথেষ্ট ভালো আছে এবং সব গাড়ি উঠছে। শুধুমাত্র সেসব গাড়ি উঠতে পারে না যেসব গাড়ির ফিটনেস নেই, পাশাপাশি যেসব গাড়ি ওভারলোড নিয়ে আসে। ওভারলোড গাড়িগুলোর জন্য আমাদের ফেরিঘাটের এ্যাপ্রোচ সড়ক, জাতীয় মহাসড়ক ও ফেরিতেও সমস্যা হচ্ছে। এগুলোকে আমাদের বন্ধ করা উচিত। এই ওভারলোড গাড়িগুলোর জন্যেই দুর্ঘটনা ঘটছে।
বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সহকারী মহা ব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, আমরা বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে যাত্রীদের সবসময় অনুরোধ করি বাস থেকে নেমে যাওয়ার জন্য এবং বাস চালকদের অনুরোধ করি খালি গাড়ি ফেরিতে উঠানোর জন্য। এমনকি আমাদের টিকিটের পিছনেও এমন নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। দুর্ঘটনা কবলিত ঘাটটিও আমাদের বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান পরিদর্শন করেছেন। তিনিও যাত্রীদের বাস থেকে নেমে ফেরিতে ওঠার নির্দেশনা দিয়েছেন।
বাস ডুবে যাওয়ার ঘটনায় বিআইডব্লিউটিসির কোনো গাফিলতি ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৩নং ফেরিঘাটে অপেক্ষমান থাকা সৌহার্দ্য পরিবহনের বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ব্রেক ফেল হয়ে নদীতে পড়ে যায়। এই বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। তবে এ ঘটনায় বিআইডব্লিউটিসির কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দায় বা গাফিলতি নেই। এ বিষয়ে সরকারের দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে তদন্ত কমিটির আমি একজন সদস্য। তদন্ত কাজে আমি সার্বিক সহযোগিতা করছি।
পন্টুন ব্যবস্থাপনায় কোনো দুর্বলতা ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, পন্টুন ব্যবস্থাপনাটি আমাদের নৌ বিভাগের কর্মকর্তারা দেখেন। নৌবিদ্যা রিলেটেড যাদের পড়াশোনা আছে এবং আমাদের মেরিন বিভাগের সংশ্লিষ্ট যারা এক্সপার্ট রয়েছেন তারা এ বিষয়টি দেখেন। পন্টুনের বিষয়টি আমাদের নৌ বিভাগের এক্সপার্টরা বলতে পারবে।
বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ দৌলতদিয়া ঘাট পরিদর্শনে এসে বলেন, পন্টুনগুলোতে নিরাপত্তার স্বার্থে রেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে, যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। যারা ফেরি ও ঘাট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত, তাদের আধুনিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে ঘাটের জরাজীর্ণতা দূর করতে দ্রুত সমাধানের কথাও জানান তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, সাধারণত গাড়িগুলো পন্টুনে আসার আগে থামে। এরপর সুবিধামতো ফেরিতে উঠে পড়ে। কিন্তু দুর্ঘটনার সময় দেখা গেছে, হাসনা হেনা ফেরিটি প্রস্তুত ছিল না, তার আগেই চালকের ভুলে গাড়িটি পন্টুনে এসেছে। নিয়ম হলো- ফেরিতে থাকা গাড়িগুলো আগে নামবে, এরপর নতুন করে যানবাহন উঠবে।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, সরকার এরই মধ্যে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে ঘাট ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও আধুনিকায়ণে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বলেন, নিহতদের দাফনের জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়েও সরকার কাজ করবে।
তবে এই দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানির নয় বরং ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, নিরাপত্তা ঘাটতি এবং দায়িত্বহীনতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। স্বজন হারানোর বেদনা আর প্রশাসনিক জবাবদিহির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট।
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!