• সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ০৬:৩৪ অপরাহ্ন

সব মেয়ের শরীর আপনাকে আকর্ষণ করবে না!

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, ২০২৪

মানুষের পোশাক নিয়ে আমি পারতপক্ষে কিছু বলি না, বলাটা শোভন নয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, আবহাওয়া এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এসব মিলেই মানুষ তা বেছে নিতে পারে এবং পারা উচিত বলে আমি বিশ্বাস করি। বিশেষ করে বাংলাদেশের মেয়েদের বদলে যাওয়া পোশাক সংস্কৃতি নিয়ে, বিচ্ছিন্নভাবে মতামত প্রকাশ করলেও তেমন বিশদ ভাবনা ওভাবে কখনও শেয়ার করিনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি আমার মতামত যাই হোক, দিন শেষে মানুষ তার একান্ত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই করে বিবেচনা। এর আরেকটি কারণ, নিজের পরিবার, আত্মীয়, বন্ধু, পরিজন এবং চেনা-অচেনা কাছের দূরের প্রায় সকলেই এখন বদলে যাওয়া সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছেন। কারো ব্যক্তিগত অনুভূতিতে আঘাত করবো সে মানুষ নই। আজ হঠাৎ মনে হলো, একটু বলি। (১১ জুন ২২ এ লেখা এটা, নিউজফিডে কোন এক বাংলাদেশি ক্রিকেটারের একটা সস্ত্রীক ছবি উঠে আসায় লিখেছিলাম)।

আসলে তো এই পরিবর্তন একদিনে হয়নি। খুব অল্প অল্প করে, কেউ স্বেচ্ছায়, কেউ একদম না ভেবে বা কেউ কেউ পারিবারিক, সামাজিক চাপে বাধ্য হয়েই নিজেদের নিয়ে গেছেন বা যাচ্ছেন অন্যরকম অচেনা এক রূপে। আমাদের অনেকের পক্ষেই হয়তো চিন্তা-চেতনা বা দর্শনের জায়গাটা ওভাবে বুঝে উঠা সম্ভব না। সকলের জীবন ধারা এক নয় বা এই যে বেছে নেয়ার বিষয়টা বা বাস্তবতাও এক নয়। এই ভাবনা আমায় অনেক ভাবিয়েছে বলেই আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি বদলে যাওয়া কিছু মুখ এবং তাদের দর্শন। যা আমায় একসময় অবাক করলেও এখন আর করে না। রানওয়ে সিনেমাটা যাদের দেখা হয়নি, দেখতে পারেন। গার্মেন্টসে কাজ করা একটা বোন চরিত্র আছে। প্রয়াত তারেক মাসুদের সিনেমা। অনেককেই ভাবাবে বুঝতে পারলে বিষয়টা।

যে মেয়েটির জন্মই হয় জীবনের ভার বহন করে জীবন ভর যুদ্ধ করে যাবার তার কাছে জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে কেবল প্রয়োজনই সবচেয়ে বড় প্রায়োরিটি হয়ে যায় সব চাওয়াতে। পোষাক নিয়ে অনেক বেশি ভেবে, অনেক অনেক টাকা খরচ করে পারিবারিক, সামাজিক দায়বদ্ধতা মেটানোর সুযোগই থাকে না। থাকে কেবল দিন শেষে নিজের আত্মসম্মানটুকু বাঁচিয়ে, নিজের ভেতরের সৌন্দর্য বোধটুকু টিকিয়ে সুস্থ একটা জীবন যাপন করে পরিবারের মুখে খাবার জুটিয়ে জীবনটা পার করা। আমি সেইসব জীবনকে দেখি আমার সবটুকু ভালোবাসা এবং সম্মানের অনুভব নিয়ে। তবে উল্টো একটা চিত্র বলি, খুব হতাশা নিয়ে মাঝে মাঝেই দেখি। হয়তো কারো জন্ম হয় স্বচ্ছল একটা জীবন নিয়ে। বৈবাহিক সূত্রেও পায় আর্থিক স্বচ্ছলতা সেইরকম অনেকেই যখন বেছে নেয় বিশেষ ধর্মীয় পোশাক। সমস্যা হচ্ছে তাদের অনেকের মাঝেই দেখা যায় এই সংস্কৃতির বাইরে থাকা মেয়েদের ঘিরে একটা ভীষণ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন।

নিজের চিন্তার বৃত্তের বাইরে থাকা মানুষটির পোশাক দর্শন নিয়ে আমরা জাজমেন্টাল হয়ে যাই। আমি ব্যক্তিগতভাবে তেমন চিন্তার মানুষের সাথে খুব বেশি কম্ফোর্টেবল নই। প্রতিবাদ করার স্কোপ হয়তো থাকে না, তবে কাছের কেউ হলে সিমপ্লি এড়িয়ে চলি। এই পোস্টে যা বলতে চাই, বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ আজকাল কেন যেন মেয়েদের সম্মান দেখেন পোশাকের দৈর্ঘ্য প্রস্থে। আর বাচ্চা ছেলে, মেয়ে থেকে বুড়ো পুরুষ মহিলা মস্তিষ্কজুড়েই আছে মেয়ের পোশাক কেমন হলে তাকে ভদ্র মেয়ের তকমা দেয়া যাবে, কেমন হলে দেয়া যাবে না। আসুন এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হবার চেষ্টা করি। আপনি যেমন দেখবেন, তেমন হবে আপনার পৃথিবী। সুস্থ, সুন্দর স্বাভাবিক এবং আজ এই লেখাটা এডিট করতে যেয়ে আর দুইটা ছত্র যোগ করি।

সেটা হচ্ছে, মিডিয়াতে কাজ করছে এমন নারী শিল্পীদের সবাই যে খুব রুচিশীল তা কিন্তু নয়। সেটা পুরো বিশ্বের কোনো দেশেই নেই। বাংলাদেশেও হয়তো হাতে গোনা, কিন্তু তাই বলে কেউ না কেউ স্রোতের বিপরীতে কোনো পোশাক পরে আলোচনায় আসতে চাইলে বা না চাইলে তাকে আপনি আমি যেভাবে এটাক করি সেটাও কিন্তু কোনো রুচিশীল ব্যক্তিত্ববান মানুষ, সমাজ বা রাষ্ট্রের কাজ নয়।

আপনার একটা ছোট প্রতিক্রিয়া, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অন্ধকার যুগে থাকা মানসিকতা যারা ধারণ করে তাদের কণ্ঠকে আরো বেশি শক্তিশালী করে দেয় আপনার অজান্তেই। আপনার কণ্ঠ হয়ে যায় তাদের হাতিয়ার, যা হয়তো আপনি সজ্ঞানে চাননি। আমি বলেছি এর আগে, আরো একবার বলি, কেউ সেক্স এপিলিং ড্রেস পরে ছবি দিয়ে বোধ হয় কেউই অসম্মানিত হতে চায় না, হেনস্থা হতে চায় না। আপনার ভালো না লাগলেই আপনি তা নিয়ে যা ইচ্ছে তাই বলার অধিকার কতটুকু রাখেন, এটা নিয়ে ভাববেন এবং তারপর সামাজিক মাধ্যমে বলবেন আশা করি।

(জানি আমার এই আহ্বান সকলকে ছুঁয়ে যাবে না, তবুও বলি)। দেশে মেয়েদের আপনি যেভাবে দেখতে চান, সেভাবে না দেখলেই রেগে যাবেন না। আপনি জানেন না, যে বা যারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় তাদের হাতের মোবাইলেই পুরো বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা নারী শরীর ঘুরছে। যাক, সবাই কুল থাকুন, মাথা ঠাণ্ডা করে এমন গান শুনুন, কবিতা পড়ুন, আকাশ দেখুন, বাতাস মাখুন এবং ভালো বই পড়ুন। কবিগুরু বলেছেন, আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ, চুনি উঠলো রাঙা হয়ে। আমি চোখ মেললুম আকাশে।

এই কথার মাজেজা না বুঝলেও আশা করি এইটুকুন বুঝতে পারবেন। এই পৃথিবীর আলো বাতাস যতটুকু আপনার, ততটুকুন একটা মেয়ে শরীর নিয়ে জন্ম নেয়া মানুষটারও। বিপরীত লিঙ্গ ধারণকারীদের বলি, জীবনে আপনি একজন নারীকেই চাইবেন, ভালোবাসবেন প্রেমিকা জ্ঞান করবেন, সব মেয়ে শরীর আপনাকে আকর্ষণ করবে না, করলে আপনি সুস্থ নন।


আপনার মতামত লিখুন :
এ জাতীয় আরও খবর