• সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ০৫:৩৮ অপরাহ্ন

জানেন কি কোথায় যায় আপনার পুরাতন কাপড় ?

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : শুক্রবার, ২৪ মে, ২০২৪

সূর্য জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামের মেঠোপথে বেরিয়ে পড়েন ফেরিওয়ালারা। কেউ সাইকেলে চড়ে, কেউ বা মালামাল বোঝাই করা ভ্যান নিয়ে সকাল শুরু করেন। কদাচিৎ বাঁক আর ঝুড়িওয়ালা ফেরিয়ালার দেখা মেলে। আইসক্রিম, সন্দেশ, হাওয়াই মিঠাই, শনপাপড়িসহ নানা লোভনীয় খাবার থাকে তাদের প্যাটিতে। কেউ কেউ খেলনা কিংবা হাঁড়িপাতিল নিয়েও হাজির হন। শুধু টাকাপয়সা বা লোহালক্কর দিয়েই নয়, পুরাতন কাপড় দিয়ে এসব জিনিস সংগ্রহ করে থাকেন গ্রামের মা-বোন কিংবা কচি-কাঁচারা। অবশ্য শহরেও এখন পুরাতন কাপড় দিয়ে জিনিস কেনার প্রচলন রয়েছে। অনেকেরই প্রশ্ন, ফেরিওয়ালারা এসব কাপড় সংগ্রহ করে কী করেন? কোথায় বিক্রি করেন? সেই কাপড়গুলো নিয়ে কী করা হয়?

দেশের অনেক উপজেলা-জেলা শহরেই পুরাতন কাপড়ের বাজার গড়ে উঠেছে। তবে সারাদেশের বেশিরভাগ পুরাতন কাপড়ই চলে আসে পুরান ঢাকার বেগমগঞ্জ এলাকার বেচারাম দেউড়িতে। জাহাঙ্গীর মার্কেট, সেন্টু-পিন্টু মার্কেট, হাফিজ মার্কেটসহ আশেপাশের দোকানে গিয়ে দেখা গেল স্তূপ করা সব জামাকাপড়। অনেকে ভ্যানে করে সেগুলো দোকানে এনে রাখছেন। দোকানের কর্মচারীরা ব্যস্ত কাপড় বাছাই করতে। কেউ আবার দরদাম করছেন ক্রেতার সঙ্গে। তাই তো এই বাজারের আরেক নাম ‘পুরাতন কাপড় বিক্রির রাজধানী’।

বেগম বাজারের ইতিহাস
পুরান জামাকাপড় বেচাকেনার ইতিহাস জানার আগে, চেনা দরকার বেগম বাজারকেও। এই এলাকার নামের পেছনে একটা ঘটনা আছে বলে স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। ১৯৩৯-১৯৪০ সালের দিকে ঢাকার নায়েব-ই-নাজিম ছিলেন সরফরাজ খানের আদরের কন্যার নাম, ‘লাডলি বেগম’-এর নামে এই এলাকাটির নামকরণ হয়েছে বেগমবাজার। বেগমবাজার মসজিদের কাছে নির্মিত মাছের বাজারের মালিক ছিলেন লাডলি বেগম। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ১৭৭৭ সালে বড় ধরনের এক অগ্নিকাণ্ডে বাজারটি পুড়ে যায়। পরে তত্কালীন সরকার নামমাত্র মূল্যের বিনিময়ে বাজারটি ক্রয় করেন।

বেগম বাজারে কাপড়ের কারবার শুরু হয় স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে। যুদ্ধের পরের বছরই অর্থাত্ ১৯৭২ সালের দিকে এখনকার চকবাজার এলাকায় পুরাতন কাপড়ের ব্যবসা শুরু হয়। এর কয়েকবছর পরই বিক্রমপুরের কয়েকজন ব্যবসায়ী চকবাজার থেকে সরে চলে আসেন বেগম বাজারে। তারা ফেরিওয়ালাদের সঙ্গে চুক্তি করে ধীরে ধীরে ব্যবসা বাড়াতে থাকেন। তখনই মূলত এলাকায় পুরাতন কাপড়ের ব্যবসার গোড়াপত্তন হয়।

পুরাতন কাপড় সংগ্রহ ও বিক্রির কায়দা
শাড়ি থেকে ওয়েস্টার্ন ড্রেস-সব ধরনের ব্যবহূত জামাকাপড়ই পাওয়া যায় এই বাজারে। প্রতি দোকানেই দেখা যায় পুরাতন জিনস প্যান্ট, শার্ট, জ্যাকেট, শাড়ি, গেঞ্জি, কাঁথা, কম্বল ও লেপের কাভারের ছোট ছোট স্তূপ। তবে ছেলেদের প্যান্ট, মেয়েদের থ্রিপিস ও শিশুদের জামাকাপড়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

আম্বার শাহ, তিন দশক ধরে এই বাজারে পুরাতন কাপড়ের ব্যবসা করছেন তিনি। দোকানের এক কোনে একটি পুরোনো চেয়ারে বসে আছেন, পাশে তিন তাকের ছোট্ট একটি ক্যাশ বাক্স। তার মতে, এই ব্যবসার প্রাণই ফেরিওয়ালারা। ফেরিওয়ালারা হাঁড়ি-পাতিলের বিনিময়ে এসব কাপড় সংগ্রহ করেন। টাকার বিনিময়েও বাসাবাড়ি থেকে কাপড় কেনেন ফেরিওয়ালারা। সেই কাপড়ের বেশিরভাগেরই গন্তব্য থাকে বেগম বাজার।

কাপড় সংগ্রহের পর চলে যাচাই-বাছাই। মান যাচাই করে তারপর সেগুলো ধুয়ে, ইস্তিরি করে বিক্রি করেন দোকানিরা। ঢাকার ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতে কাপড় বিক্রি করেন এমন ব্যবসায়ীরা এই পুরাতন কাপড়ের সবচেয়ে বড় ক্রেতা বলে জানান আম্বার শাহ। তবে অনেক হতদরিদ্র মানুষও এখান থেকে কাপড় কেনেন নিয়মিত।

রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলের ঠিক উল্টো পাশে নিয়মিত পুরান কাপড় বিক্রি করেন আমিনুল। তিনি এখান থেকে কাপড় পাইকারি দামে কেনেন। তিনি বলেন, ‘৫/১০ টাকা দরে এখান থেকে শার্ট-প্যান্ট কিনি। এগুলো পুরাতন পোশাক এবং এক-আধটু ছেঁড়া থাকে। দেখা গেল ৩০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি করতে পারি।’

একদম অব্যবহারযোগ্য (পচা) কাপড়ও বিক্রি করেন বেগম বাজারের ব্যবসায়ীরা। এরপর তারা সেগুলো প্রিন্টিং প্রেস, গাড়ি রং করার ওয়ার্কশপ ও আসবাবপত্র তৈরির কারখানার মালিকদের কাছে বিক্রি করেন।

ঈদ ও শীতে ব্যবসা ভালো…
এক যুগ বছর ধরে নানা জায়গায় ঘুরে কাপড় সংগ্রহ করেন রহিম হাসান। তিনি বলেন, ‘এখন সেরকম বিক্রি করতে চায় না কেউ। পাতিল কিংবা টাকার বিনিময়ে আমরা কাপড় কিনি। কিন্তু দাম কম বলায় অনেকে আমাদের কাছে বিক্রি করতে চায় না। কিন্তু আমাদের লাভের কথা তো আমাদেরই ভাবতে হয়। কাপড় জমিয়ে এখন সরাসরি এখানেই বিক্রি করতে আসি।’

তার ভাষ্য মতে, জিনস প্যান্ট প্রতি পিস তিন থেকে পাঁচ টাকায় কেনেন। পণ্যের মান ভালো হলে আবার দামও একটু বেড়ে যায়। আর লুঙ্গি প্রতি পিস ৫-১০ টাকা, শার্ট ১০-২০ টাকা, শাড়ি ২০-২৫ টাকা, লেপের কাভার ৩০-৩৫ টাকায় কিনে থাকেন।

লাভ কেমন হয় জানতে চাইলে ব্যবসায়ী হাফিজ বলেন, ‘এখানকার সব ক্রেতা নিম্নবিত্ত। ফলে দামও বুঝে-শুনে বলতে হয়। মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা লাভ থাকে। তবে ঈদ ও শীতের মৌসুমে ব্যবসা দ্বিগুণ বেড়ে যায়।


আপনার মতামত লিখুন :
এ জাতীয় আরও খবর