• সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ১১:১৪ পূর্বাহ্ন

১৪৪ টাকা পারিশ্রমিক, ১০০০ টাকা ‘বকশিশ’

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : রবিবার, ১৯ মে, ২০২৪

সরকারি এক গুদাম থেকে অন্য গুদামে প্রতিদিন শত শত ট্রাকে পরিবহন করা হয় খাদ্যপণ্য। খাদ্য নিয়ন্ত্রণ বিভাগের নিয়োগ করা হ্যান্ডলিং ঠিকাদারের শ্রমিকরা এসব পণ্য ট্রাকে বোঝাই-খালাস (লোড-আনলোড) করেন। এ জন্য প্রতি টনে ১২০ থেকে ১৪৪ টাকা হারে কমিশন পেয়ে থাকেন হ্যান্ডলিং ঠিকাদার। এর পরও পরিবহনে নিয়োজিত ঠিকাদারের কাছ থেকে ট্রাকপ্রতি ১ হাজার টাকা করে বাড়তি নিচ্ছেন হ্যান্ডলিং ঠিকাদাররা। এটাকে তারা ‘বকশিশ’ বললেও পরিবহন ঠিকাদাররা বলছেন, এটা বকশিশ নয়, স্রেফ চাঁদাবাজি। দীর্ঘদিন জোর করে এ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এ চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে এবার খাদ্যপণ্য পরিবহন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন তারা।

বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ বিভাগ। কর্মকর্তাদের কেউ বলছেন, হ্যান্ডলিং ঠিকাদার ও তাদের নিয়োজিত শ্রমিকরা যেহেতু নির্দিষ্ট হারে কমিশন ও পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন, তাই এর বাইরে বাড়তি টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। আবার কেউ বলছেন, এটা হ্যান্ডলিং ও পরিবহন ঠিকাদারের বিষয়। এ নিয়ে তাদের করার কিছু নেই।

খাদ্য নিয়ন্ত্রণ বিভাগ ও পরিবহন ঠিকাদার সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট সিএসডি গোডাউন, হালিশহর সিএসডি গোডাউনসহ (সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপো), চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, ব্রাক্ষণবাড়িয়া ও সিলেটের সব এলএসডিতে (লোকাল স্টোরেজ ডিপো) বকশিশের নামে বাড়তি টাকা আদায় করা হচ্ছে। এ নিয়ে পরিবহন ঠিকাদারদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।

অভিযোগ রয়েছে, ট্রাকে পণ্য লোড-আনলোডে সরকার নির্দিষ্ট হারে পারিশ্রমিক দিলেও শ্রমিকদের ঠকায় হ্যান্ডলিং ঠিকাদাররা। তাই পারিশ্রমিক তুলে আনতে পরিবহন ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়। এতে লাভের ওপর লাভ হ্যান্ডলিং ঠিকাদারের। সরকারের কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী একদিকে কমিশন পাচ্ছেন, আবার নিয়ে নিচ্ছেন বকশিশের নামে আদায় করা টাকার সিংহভাগ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাট গোডাউনের একাধিক শ্রমিক বলেন, হ্যান্ডলিং ঠিকারাদারের প্রতিনিধি পরিবহন ঠিকাদারের প্রতিনিধির কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করে থাকেন। এর ছোট একটি অংশ তাদের দেওয়া হলেও বড় অংশ ঠিকাদার রেখে দেন। তাই শ্রমিকের বদনাম হলেও লাভবান হন ঠিকাদার। শ্রমিকরা জানান, সরকার শ্রমিকদের মজুরি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করে থাকে। তবে অনেক ক্ষেত্রে ঠিকাদাররা শ্রমিকের নামে মোবাইল ফোনের সিম নিয়ে সেখানে টাকা গ্রহণ করে একটি অংশ নিজেরাই রেখে দেন।

বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় খাদ্য পরিবহন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী শাহিদুর রহমান বলেন, ‘ট্রাকে খাদ্যপণ্য বোঝাই ও খালাসে সরকার যে হারে টাকা দিচ্ছে, সেটা ভালোই বলতে হবে। এ নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে বলেও আমার জানা নেই। এর পরও পরিবহন ঠিকাদারকে জিম্মি করে বাড়তি টাকা আদায় করছে তারা। এটা মেনে নেওয়া যায় না। খাদ্য নিয়ন্ত্রণ বিভাগকে এটা জানানো হলে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে আমরা খাদ্যপণ্য পরিবহন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবো।’

চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট সিএসডি গোডাউনের হ্যান্ডলিং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জয় কনস্ট্রাকশনের কর্ণধার সৈয়দ মাহমুদুল হক বলেন, ‘আমরা কোনো বাড়তি টাকা নিই না। পরিবহন ঠিকাদাররা যদি আমাদের শ্রমিকদের দিয়ে ট্রাকে ওভারলোড করাসহ বিভিন্ন বাড়তি কাজ করান এবং এ জন্য শ্রমিকদের বাড়তি টাকা দিয়ে থাকেন, সেটা তাদের বিষয়।’

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক এস এম কায়সার আলী বলেন, ‘ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োজিত শ্রমিকরা ট্রাকে খাদ্য বোঝাই ও খালাস করে থাকে। এ জন্য চুক্তি অনুযায়ী পরিবহন ঠিকাদার কিংবা কৃষকের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। কেউ যদি এ ধরনের টাকা আদায় করে সেটা চুক্তির লঙ্ঘন। এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে চট্টগ্রামের খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুমাইয়া নাজনীন বলেন, ‘বিষয়টি পুরোটাই হ্যান্ডলিং ও পরিরবহন শ্রমিকের বিষয়। এখানে আমাদের করার কিছু নেই।’

এদিকে বকশিশের নামে চাঁদাবাজির বিষয়টি নিয়ে গত ২ মে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় খাদ্য পরিবহন অ্যাসোসিয়েশন। এ ছাড়া অন্য যেসব অঞ্চলে এভাবে বাড়তি টাকা নেওয়া হচ্ছে, সেসব অঞ্চলের খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তরেও অভিন্ন চিঠি দিয়ে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিবহন ঠিকাদার বলেন, ‘দীর্ঘদিন বকশিশের নামে চাঁদাবাজি হলেও খাদ্য নিয়ন্ত্রণ বিভাগ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তাই আমরা হার্ডলাইনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। খাদ্যপণ্য পরিবহন বন্ধ হলে সরবরাহ চেইনে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এর দায়দায়িত্ব কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।’

 


আপনার মতামত লিখুন :
এ জাতীয় আরও খবর