• সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ১০:২৩ পূর্বাহ্ন

ফুলের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১৬ মে, ২০২৪

প্রতি বছরই জাপানে চেরি ফুল ফোটার সময় নানা স্থির ও ভিডিও চিত্র সারা পৃথিবীর নানা পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলে প্রদর্শিত হয়। জাপানে চেরি ফোটার সময়কে বলা হয় হানামি। এই সময় জাপানে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজন সবাই মিলে একসাথে চেরি ফুল ফোটা দেখতে যাওয়া, সবাই মিলে গল্প করা, আনন্দ করার সময়টি জাপানি অর্থনীতির জন্য কিছু প্রণোদনাও জোগায়।

দ্য জাপান টাইমস পত্রিকায় ২০২৪ সালের ১৫ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে, এই বছর জাপানে হানামি বা চেরি ফোটার মৌসুমে ১.১৪ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ৭.৭ বিলিয়ন মার্কিনি ডলার লাভ হবে। ২০২৩ সালে চেরি ফোটার সময়ে জাপানের নগদ আয় হয়েছিল ৬১৬ বিলিয়ন ইয়েন এবং এই বছর সেই আয়ের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় দ্বিগুণ বলেই মনে করছেন জাপানের ওসাকায় কানসাই ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক কাতসুহিরো মিয়ামোতো।

দীর্ঘদিন ধরেই হানামি বা চেরি ফুল ফোটা উপভোগ করাটা জাপানে এক জাতীয় অনুষ্ঠান উদযাপনের মতো বিষয় হয়ে উঠেছে। সুন্দর সাকুরা বা চেরি ফুল এখন পর্যটনের সম্পদ হয়ে উঠেছে, আকর্ষণ করছে অসংখ্য বিদেশি পর্যটকদের, অধ্যাপক কাতসুহিরো মিয়ামোতো মনে করেন।

কোভিডের সময়ে বিদেশি পর্যটকদের জাপানে আসতে দেওয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে চেরি ফুলকেন্দ্রিক বিদেশি মুদ্রা অর্জনে কিছুটা ধস নামলেও ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে ৩২ শতাংশ বেশি বিদেশি পর্যটকেরা জাপানে আসছেন।

২০২৩ সালে যেখানে বিদেশি পর্যটকেরা চেরি ফুলের মৌসুমে জাপানে এসে দিন প্রতি ২৮,৫৮০ ইয়েন খরচ করেছেন, ২০২৪ সালে তারা দিন প্রতি ৩০,২৮৬ ইয়েন করছেন—অবশ্য এর পেছনে জাপানি মুদ্রাস্ফীতিও খানিকটা দায়ী।

২০২৪ সালে জাপানের প্রধান ভ্রমণ এজেন্সি জেটিবি-র মতে, সব মিলিয়ে ৩.৭৩ মিলিয়ন বা ত্রিশ লাখ ৭৩ হাজার বিদেশি পর্যটক জাপানে হানামি বা চেরি ফোটার সময়টায় জাপান ভ্রমণে আসবেন। চেরি ফোটার এই মৌসুম শুরু হয় দেশটির দক্ষিণে কিয়ুশু এলাকায় মার্চের শেষে এবং হোক্কাইডোয় মে মাসের শুরু অবধি অব্যাহত থাকে চেরি ফুলের নান্দনিক বিভার এই ঘোর ধরানো সময়।

চেরি ফুল নিয়ে জাপানে লেখা হয়েছে অসংখ্য হাইকু বা তিন পঙ্‌ক্তির জাপানি কবিতা। যেমন কোবাইশি ইসসার বিখ্যাত হাইকু ‘প্রস্ফুটিত চেরির নিচে/অপরিচিতরা নয়/সত্যিই অপরিচিত।’

এমনি এই সাদা ও গোলাপি বর্ণের চেরির রূপ যার নিচে দাঁড়ালে অচেনা মানুষকেও চেনা বন্ধুর মতো মনে হয়। অথবা অষ্টাদশ শতকের কবি ইয়োসা বুসোর কলমে—‘আমার সামনের দরজায়/সেই চেরি গাছ/আমাদের মেঘমালার সূচনা।’

আবার চেরির পাপড়িতে সমাকীর্ণ জাপানের বৌদ্ধ-শিন্তো মন্দিরের প্রশান্ত রূপ বর্ণনায় কোনো কবি আবার লিখছেন—‘ঝরে পড়েছে চেরির যত পাপড়ি/মন্দির তাই আজ/চেরিশাখার দখলে।’

আমরা প্রকৃতি সংহারী বাঙালি। নিছক ক’টা টাকার লোভে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা দেশটির গাছপালা সব কেটে, জলাশয় ভরাট করে নিজেরাই নিজেদের ছায়া-মায়া ঘেরা দেশকে মরুভূমি করে তুলছি।
জাপানের চেরির মতোই হল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডসের টিউলিপও দেশকে জোগায় প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিলের ‘দ্য ব্রাসেলস টাইমস’ পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে, ২০২২ সালেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পৃথিবীর নানা দেশে ১০০ মিলিয়ন ইউরোর সমমূল্যের অর্কিড, নার্সিশি এবং টিউলিপ রপ্তানি করেছিল। এই রপ্তানির ৮১ শতাংশই হয়েছে নেদারল্যান্ডস থেকে। আর নেদারল্যান্ড অর্থই হলো টিউলিপ।

জানা যায় যে, ইউরোপে ১৬৩৪ সাল নাগাদ টিউলিপ খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং ১৬৩৭ সাল নাগাদ টিউলিপের বিক্রি এত বেড়ে যায় যে মাথাপিছু আয়ের নিরিখে শুধুমাত্র টিউলিপ বাণিজ্য থেকেই ডাচরা সেই সময় সারা পৃথিবীর ভেতর সবচেয়ে বিত্তশালী দেশ হয়ে উঠেছিল।

এছাড়া নেদারল্যান্ডস ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরেও পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোয় বছরে ৮১.৯ মিলিয়ন ইউরোর সমমূল্যের টিউলিপ রপ্তানি করে। নেদারল্যান্ডসের পরেই টিউলিপের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ হলো লিথুয়ানিয়া। যারা বছরে ৬.৭ মিলিয়ন ইউরোর সমপরিমাণ টিউলিপ রপ্তানি করে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, টিউলিপ ফোটারও প্রকৃষ্ট সময় কিন্তু মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে মে মাসের মধ্যবর্তী সময়টুকুই। সোজা কথায় শীত চলে গিয়ে বসন্ত থেকে গ্রীষ্মকালই টিউলিপ ফোটার সুন্দর সময়। আবহাওয়ার উত্তাপের ওপরও টিউলিপ ফোটা না ফোটা নির্ভর করে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় টিউলিপ এক থেকে দুই সপ্তাহের বেশি থাকে না।

আমাদের দেশের প্রখর উত্তপ্ত গ্রীষ্মও সেজে উঠছে রক্তাভ কৃষ্ণচূড়া, হলদে রাধাচূড়া আর বেগুনি জারুলের নানা রকম রঙে। এই পুষ্পহার বা পুষ্পসজ্জাকে কীভাবে আন্তর্জাতিক পর্যটনের বিষয় করে তোলা যায় তা নিয়ে আমাদের নীতিনিসর্ধারকেরা একটু ভাবার সময় পাবেন কী?

জাপান বা নেদারল্যান্ডের কথা তো অনেক হলো। এবার নিজের দেশের দিকে চোখ ফেরানো যাক। বাংলার বসন্তে শিমুল-পলাশ শেষ হতে না হতেই এপ্রিল থেকে জুন অবধি ঢাকার পিচ ঢালা কংক্রিটের সড়কগুলো ভরে ওঠে কৃষ্ণচূড়া-জারুল-রাধাচূড়া-সোনালু ফুলের পাপড়িতে।

বৈশাখের ভয়ানক দাবদাহের ভেতরেও সংসদ ভবনের রাস্তায় বা বিশেষত চন্দ্রিমা উদ্যানের সামনে গেলে কি মনে হয় না শত কষ্টের ভেতরেও ‘আমার এই দেশেতেই জন্ম যেন/এই দেশেতেই মরি!’? যেন বা রক্তবর্ণ শাড়ি পরা সারি সারি কৃষ্ণচূড়া তাদের গর্বোদ্ধত গ্রীবা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।

তবে কিনা আমরা প্রকৃতি সংহারী বাঙালি। নিছক ক’টা টাকার লোভে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা দেশটির গাছপালা সব কেটে, জলাশয় ভরাট করে নিজেরাই নিজেদের ছায়া-মায়া ঘেরা দেশকে মরুভূমি করে তুলছি। তাই জাপানি বা ডাচদের মতো চেরি বা টিউলিপ ফুলকে আন্তর্জাতিক পর্যটন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু করে তুলে দেশের জন্য কিছু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ইতিবাচক কোনো বুদ্ধি বা পরিকল্পনা কি আমাদের আছে? হওয়া সম্ভব?

শুধু কি এই কৃষ্ণচূড়া-জারুল-রাধাচূড়া-সোনালু ফুলের সময়টাই? শরতের কাশবন? এই তো গেল অক্টোবরে বাড়ির কাছে এক কাশবনে একটি গানের জন্য চিত্রায়নের কাজে গিয়ে দেখি গোটা কাশবনই লাপাত্তা। প্রমোটাররা কাশবন সব কেটে ফেলে বহুতল ভবন তুলছে। তারপর পড়িমরি করে কেরানীগঞ্জের কাছে গিয়ে একটি কাশবন তবু পাওয়া গেল।

অক্টোবর থেকে নভেম্বর অবধি সারা দেশে যে অসংখ্য কাশবন—তাকে কি কখনো আন্তর্জাতিক পর্যটকদের দৃষ্টিগোচরে আনার কথা ভেবেছি আমরা? বসন্তের পলাশ শিমুল? এই তো ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহেও গ্রামে গিয়ে দেখেছি পথে পথে শিমুলের অনিঃশেষ বিস্তার। একে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের নজরে আনা যায় না? সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘পথের পাঁচালী’র সেই অপরূপ কাশবনের সৌন্দর্য কোনোদিনই কি ভোলা সম্ভব?

মে মাস বস্তুত শুধু ইউরোপে মে ফ্লাওয়ার-এর সময় নয়। দেখা যাচ্ছে, জাপান থেকে বাংলা অবধি বসন্ত থেকে গ্রীষ্ম যেন ফুল সংগ্রহের অনিঃশেষ সময়। এই মে মাসেই রাস্তা বা বাড়ির সামনে অসংখ্য বাগানবিলাস বা কাগজ ফুলের রঙিন বাহারেও চোখ জুড়িয়ে যায়।

গোটা পৃথিবী জুড়েই মে মাস যেন হরেক পুষ্পের প্রস্ফুটন কাল। ইংরেজি সাহিত্যের বিখ্যাত কবি ও লেখক স্যার ওয়াল্টার স্কটের বিখ্যাত কবিতা ‘Brignall Banks’-এর শুরুর চার পঙ্‌ক্তিতেই বলা হচ্ছে—‘BRIGNALL banks are wild and fair/And Greta woods are green/And you may gather garlands there/Would grace a summer queen.’

ফুলের মালায় তাই যে গ্রীষ্মের রাণীকে বরণ করার কথা তো ইউরোপে একদা প্রচলিত ‘মে ফ্লাওয়ার’ রীতির মান্যতা দিতেই। আমাদের দেশের প্রখর উত্তপ্ত গ্রীষ্মও সেজে উঠছে রক্তাভ কৃষ্ণচূড়া, হলদে রাধাচূড়া আর বেগুনি জারুলের নানা রকম রঙে। এই পুষ্পহার বা পুষ্পসজ্জাকে কীভাবে আন্তর্জাতিক পর্যটনের বিষয় করে তোলা যায় তা নিয়ে আমাদের নীতিনিসর্ধারকেরা একটু ভাবার সময় পাবেন কী?

অদিতি ফাল্গুনী ।। উন্নয়নকর্মী, কবি, কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক

 


আপনার মতামত লিখুন :
এ জাতীয় আরও খবর