• বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ১১:১৭ পূর্বাহ্ন

ভারতের নির্বাচন : ভূ-রাজনৈতিক এবং আঞ্চলিক তাৎপর্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : সোমবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৪

১৯ এপ্রিল ২০২৪ থেকে শুরু হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের লোকসভা নির্বাচন। মোট সাত ধাপের এই নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২৬ এপ্রিল। ১ জুন সর্বশেষ ধাপের নির্বাচনের পর ভোট গণনা শুরু হবে ৪ জুন। এবারের নির্বাচনে বিজেপি’র নেতৃত্বে এনডিএ জোটের বিপক্ষে লড়ছে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল কংগ্রেসসহ ২৭ দলের ‘ইন্ডিয়া’ জোট।

বিগত দুটি সাধারণ নির্বাচনে একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী দল কংগ্রেস চরমভাবে ধরাশায়ী হয়েছিল বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে। এবারের নির্বাচনে কী ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে খোলা চোখে দেখতে গেলে আরেকবারের মতো, অর্থাৎ টানা তৃতীয়বারের মতো নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

শুধু তাই নয়, বিজেপি ২০১৯ সালের নির্বাচনে যেখানে ৫৪৩ আসনের লোকসভায় ৩০৩টি আসন পেয়েছিল, এবার তারা জোটগতভাবে ৪০০টি আসনে নির্বাচিত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগোচ্ছে।

প্রথম ধাপের নির্বাচনের পর শাসকদল বিজেপির কপালে কিছুটা চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। এই ধাপে ৬০ শতাংশ ভোটার ১০২টি আসনে প্রার্থী নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ভোটার উপস্থিতি কমার ফলে তাদের প্রত্যাশিত আসন প্রাপ্তিতেও হিসাবের গড়মিল হতে পারে। ২০১৯ সালে এককভাবে ৩০৩টি আসন প্রাপ্তির বাইরে জোটগতভাবে এনডিএ’র মোট আসন ছিল ৩৫৩টি। এবার তারা এককভাবে ৩৭০টি এবং জোটগতভাবে ৪০০-র অধিক আসন প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করেছে।

এই ৩৭০টি আসনের লক্ষ্যমাত্রার একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজয়ের পর সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ স্থগিত করে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা হরণ করেছিলেন, যা পরবর্তীতে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট বৈধ বলে রায় দিয়েছিল। বিষয়টি তারা এবার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।

বিজেপি সরকার মনে করে তাদের এই সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে এর বৈধতা তাদের রাজনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে। আর ভোটার উপস্থিতির হার কম হওয়ার ফলে বিজেপির দুশ্চিন্তার প্রধান কারণ হচ্ছে তাদের জনসংখ্যার ৮০ শতাংশই হিন্দু, যাদের বেশিরভাগই বিজেপির ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত। তুলনামূলকভাবে হিন্দু ভোটারদের কম উপস্থিতি তাই তাদের জন্য ভাবনার কারণ। শুধু নিজ দেশেই নয়, বিশ্ব হিন্দু জনসংখ্যার ৯৪ শতাংশেরই বসবাস ভারতে। আর ভারতের জনসংখ্যা বিশ্ব বিস্তৃত, যারা ভারতের হয়ে বিভিন্ন দেশে কাজ করছে।

দেশটির মোট জনসংখ্যা ১৪১ কোটি, যা কিছুদিন আগে চীনের জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে গিয়ে জনসংখ্যার দিক দিয়ে বৃহত্তম দেশে পরিণত হয়েছে। মোট ভোটারের সংখ্যা ৯৬ কোটি ৯০ লক্ষ। আরও মজার বিষয় হচ্ছে, ৮৫ বছর থেকে ৯৯ বছর বয়সের ভোটার সংখ্যা ৮২ লক্ষ। এর বাইরে রয়েছে ধর্ম, বর্ণ, জাতিতে বৈচিত্র্য।
ভারতের লোকসভা নির্বাচনের ভোটারদের সার্বিক চিত্র দেখলেই এই নির্বাচন নিয়ে বিশ্বের মানুষের আগ্রহের কারণ কিছুটা অনুমান করা যাবে। দেশটির মোট জনসংখ্যা ১৪১ কোটি, যা কিছুদিন আগে চীনের জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে গিয়ে জনসংখ্যার দিক দিয়ে বৃহত্তম দেশে পরিণত হয়েছে। মোট ভোটারের সংখ্যা ৯৬ কোটি ৯০ লক্ষ।

আরও মজার বিষয় হচ্ছে, ৮৫ বছর থেকে ৯৯ বছর বয়সের ভোটার সংখ্যা ৮২ লক্ষ। এর বাইরে রয়েছে ধর্ম, বর্ণ, জাতিতে বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্যের বাইরে বিভিন্ন ধরনের জাতি এবং নৃতাত্ত্বিক সমস্যা থাকলেও দিনশেষে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ একটি শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের মধ্যে এক সমীহ জাগানিয়া অবস্থায় রয়েছে।

বিজেপির মধ্যে কী এমন যাদু আছে যে ভারতের সাধারণ ভোটাররা ক্রমেই তাদের দিকে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন, তা বর্তমান সময়ের অন্যতম আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে কাজ করছে। দেশে ব্যাপক বেকারত্ব, অর্থনৈতিক মন্দা, বিভিন্ন স্থানে কৃষকদের বিদ্রোহ, বিরোধী দলের ধরপাকড়, গণমাধ্যমের লাগাম টেনে ধরা, দুর্নীতি ইত্যাদি শত অভিযোগের পরও বিরোধীদলের ওপর জনগণের আস্থা রাখতে না পারা এক বিস্ময়ের বিষয়!

ভারত কেবল বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশই নয়, আঞ্চলিক রাজনীতিতে অন্যতম প্রভাব বিস্তারকারী দেশ। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির মেরুকেন্দ্রিকতা বিবেচনায় ভারত তার অনন্য অবস্থান অক্ষুণ্ন রেখে চলছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আক্রমণ—সবকিছুতেই ভারত নীতিগতভাবে তাদের পররাষ্ট্রনীতিকে যেকোনো ধরনের প্রভাব বলয়ের বাইরে রাখতে পেরেছে।

প্রায় তিন দশক ধরে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলদারীত্বের সম্পর্ক অব্যাহত রেখে চললেও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের অনুরোধ, নিষেধাজ্ঞা এবং হুমকি সত্ত্বেও তারা রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে চলছে। এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বলয়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও ভারত ধীরে চলো নীতিতে এগোচ্ছে।

নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে পশ্চিমা বিশ্বের স্বার্থের প্রতিকূলে অনেক অবস্থান নেওয়া সত্ত্বেও ভারতের রাজনীতিতে পশ্চিমাদের প্রভাব থেকে দেশকে অনেকটাই মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন মোদি। এর এর মূলে রয়েছে প্রবল হিন্দু জাতীয়তাবাদী চেতনা। দেশটির হিন্দু জনগোষ্ঠীর ক্রমাগতভাবে বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়া প্রধানমন্ত্রী মোদির জন্য ইতিবাচক হয়ে কাজ করছে। অবশ্য এর জন্য মোদিকেও কম কৌশল অবলম্বন করতে হয়নি।

ভারত কেবল বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশই নয়, আঞ্চলিক রাজনীতিতে অন্যতম প্রভাব বিস্তারকারী দেশ। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির মেরুকেন্দ্রিকতা বিবেচনায় ভারত তার অনন্য অবস্থান অক্ষুণ্ন রেখে চলছে।

দেশটির সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার বিধান থাকলেও নরেন্দ্র মোদি এক দশক ধরে যেভাবে দেশ পরিচালনা করছেন সেই জায়গায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো অনেক বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। এই সবকিছুর মূলে রয়েছে দেশটির বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমর্থন।

নরেন্দ্র মোদিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় এরকম আরও অনেক কৌশল প্রয়োগ করতে হয়েছে, যা তার এবং দলের ভিত্তিকে আরও মজবুত করেছে। দেশটির সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে কয়েকবছর ধরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তোপের মুখে থাকা সত্ত্বেও তিনি সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন চূড়ান্ত করেছেন, যার মধ্য দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, শিখ এবং জৈন সম্প্রদায়ের মানুষদের ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নিজেদের বিরুদ্ধে বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং নেতাদের দুর্নীতি অনুসন্ধানে ইডি, সিবিএসহ রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দাদের লেলিয়ে দিয়েছেন, যার জেরে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ অনেক নেতাকেই নির্বাচনের আগে কারাগারে যেতে হয়েছে। মূল কথা ভোটের মাঠে বিজেপিকে কীভাবে টিকিয়ে রেখে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা যায়, একধরনের গণতান্ত্রিক বাতাবরণের মধ্য দিয়ে তিনি সেই বিষয়গুলোই প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। আর তাই এবারের নির্বাচনে বিজেপি বিজয়ী হয়ে আবারও সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করছেন।

নরেন্দ্র মোদি যখন ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন তার ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি দেশে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোয় ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করলেও সময়ের পরিক্রমায় কেবল বাংলাদেশ ছাড়া অপরাপর সব দেশগুলোর সাথেই তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক একধরনের তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এমনকি নেপাল, ভুটান এবং মালদ্বীপের মতো ক্ষুদ্র দেশগুলোর সাথেও। এর পেছনে অবশ্য ‘চীন ফ্যাক্টর’ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে কাজ করেছে।

আঞ্চলিক রাজনীতিতে চীনের বিপক্ষে প্রতিবেশী দেশগুলোয় প্রভাব বিস্তার করতে মোদি ব্যর্থ হলেও ব্যাপক সংখ্যার হিন্দু ভোটারদের মধ্যে এর খুব একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। অবশ্য আজকাল মোদির বিরুদ্ধে এটাও বলতে শোনা যায় যে, বিভিন্নভাবে গণমাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার ফলে দেশের প্রকৃত চিত্র সেইভাবে ফুটে উঠছে না। তারপরও বিরোধী দলের অবস্থা পর্যবেক্ষণে এটা অনুমান করা কঠিন নয় যে ১০ বছর সময়ে তারা মোদির বিরুদ্ধে খুব একটা একাট্টা হয়ে উঠতে পারেনি।

ভারতের নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে একটু বেশি থাকে। যদিও বর্তমান বাস্তবতায় এর খুব একটা শক্ত কারণ রয়েছে বলে মনে করার কোনো অবকাশ নেই। একসময় মনে করা হতো যে ভারতের কংগ্রেস দলের শাসন বাংলাদেশের জন্য সুফল বয়ে আনে। ইতিহাস পর্যালোচনায় এটা বলা যেতে পারে যে, বিষয়টি নির্ভর করে বাংলাদেশে কোন সরকার বিরাজ করছে। এর আগে কংগ্রেস এবং বিজেপি উভয়ের শাসনামলে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অনেক তিক্ততা আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি।

আসলে আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে ভারত রাষ্ট্রের যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তা অনেক বেশি প্রতিভাত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার টানা ১৫ বছরের অধিককাল ধরে রাষ্ট্র পরিচালনায় কংগ্রেস শাসনামলে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের যে ধরনের উষ্ণতা পরিলক্ষিত হয়েছে, বিজেপি শাসনামলে তা কোনো অংশেই কম নেই।

ভারত আসলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার স্বার্থে বাংলাদেশকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়, যা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডে তারা খুঁজে পায়। আর তাই একটি শক্তিশালী ভারতীয় জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের ধারক এবং বাহক হিসেবে সেইখানকার যেকোনো দলের সরকারই আপাতত আমাদের জন্য কোনো ধরনের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে না।

ড. ফরিদুল আলম ।। অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


আপনার মতামত লিখুন :
এ জাতীয় আরও খবর