• বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ০৯:৫৭ পূর্বাহ্ন

কিশোর গ্যাং চালায় কারা?

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : শনিবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৪

মূল লেখায় যাওয়ার আগে একটা গল্প বলি। গল্প নয় বাস্তব ঘটনা। ঘটনাটি ঘটেছিল রাজধানী ঢাকায়। ২০১৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। না শীত না গরমের এই সময়টাতে চারপাশে ঝকঝক করে রোদ। ঝলমলিয়ে হাসে প্রকৃতি। এমন এক দিনে ঢাকার খিলক্ষেত থানায় হাজির হয় এক কিশোর। বয়স চৌদ্দ কি পনের।

হালকা পাতলা শরীর। পরনে থ্রি কোয়াটার প্যান্ট আর টি-শার্ট। সে জানায় কাওলা এলাকায় বাইশ বছর বয়সী পাভেলকে মারধর করছে তার বন্ধুরা। ঘটনা শুনে পুলিশ কিশোরকে নিয়ে হাজির হয় ঘটনাস্থলে। ততক্ষণে মারা গেছে পাভেল। ছুরিকাঘাত এবং মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে তাকে। লাশ উদ্ধার করে হাসপাতালের মর্গে পাঠায় পুলিশ।

অভিযোগকারী কিশোরের দেওয়া তথ্যমতে, অপরাধীদের খুঁজতে থাকে পুলিশ। হত্যার দুইদিন পর ছায়া তদন্ত (Shadow Investigation)-এ নামে গোয়েন্দা পুলিশ। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কারা। থানা পুলিশের ধারণা ছিল মাদক সেবন অথবা জুয়ার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে মারামারিতে খুন হয়েছে পাভেল। কারণ এর আগেও কয়েকবার জুয়ার আসর থেকে আটক হয়েছে পাভেল ও তার বন্ধুরা।

এছাড়া কাওলার এই এলাকায় মাদক সেবন ও খুচরা বেচাবিক্রির খবর পাওয়া যায় প্রায়ই। কিন্তু গোয়েন্দা পুলিশের কাছে বিষয়টা এত সরল মনে হয় না। অন্যকিছুর গন্ধ পায় তারা। অভিযোগকারী কিশোরকে ডেকে আনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। কিশোরের ডান হাতের আঙুলে তখন ব্যান্ডেজ । ব্যান্ডেজ কেন? কিশোর জানায়—পাভেলকে যখন তার বন্ধুরা মারছিল তখন আটকাতে যায় সে। ছুরির আঘাত লেগে কেটেছে আঙুল। তাই এই ব্যান্ডেজ।

গোয়েন্দা পুলিশ সংগ্রহ করে ২২ ফেব্রুয়ারির থানার সিসিটিভির ফুটেজ। কিশোরকে হেঁটে থানায় ঢুকতে দেখা যায়। তখনো ব্যান্ডেজ করা ছিল তার আঙুলে। নিশ্চয় আঙুল ব্যান্ডেজ করে তারপর থানায় গিয়েছে কিশোর! কিন্তু যদি পাভেলকে রক্ষা করাই তার উদ্দেশ্য হবে তাহলে তো ফার্মেসিতে গিয়ে ব্যান্ডেজ করে তারপর থানায় এলো কেন সে?

তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে গোয়েন্দা পুলিশ। নানাভাবে কাউন্সিলিং করা হয় তাকে! এক পর্যায়ে অভিযোগকারী কিশোর স্বীকার করে সে-ই ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে পাভেলকে! কিন্তু কেন এই হত্যাকাণ্ড? সেই আলোচনায় পরে আসছি।

ঢাকার উত্তরায় ২০১৭ সালে দুই কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বে খুন হয়েছিল স্কুলশিক্ষার্থী আদনান কবির। তার বাবা মো. কবির হোসেন গণমাধ্যমে বলেছেন, তিনি সন্তান হত্যার বিচার এখনো পাননি। আর কিশোর গ্যাংয়ের হুমকিতে তিনি উত্তরা ছেড়েছেন। মূলত ২০১৭ সালে দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে আদনান কবির খুন হওয়ার পরই ব্যাপক আলোচনায় এসেছিল কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতার বিষয়গুলো।

সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাণিজ্য নগরী চট্টগ্রামে সক্রিয় আছে কিশোর গ্যাংয়ের পাঁচশো সদস্য। ছিনতাই চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে নারীদের উত্ত্যক্ত করা, টেণ্ডার, দখল বাণিজ্য, মাদক ব্যবসা ও সেবন, খুনোখুনি—অপরাধের যত ধরন আছে সবগুলোর সঙ্গে জড়িত হচ্ছে এরা। এ তো গেল একটি নগরীর কথা। আবারও চোখ রাখা যেতে পারে রাজধানী ঢাকায়। এখানকার চিত্রও অনেকটা একই রকম।

তথ্য বলছে, ১৭ বছরে কিশোর অপরাধীদের হাতে ঢাকায় খুন হয়েছেন ১২০ জন। গেল দুই বছরে খুন হয়েছেন ৩৪ জন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের হিসাব বলছে, ২০২৩ সালে ঢাকায় যতগুলো খুন হয়েছে তার ২৫টির পেছনে ছিল কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন বলছে ঢাকায় ছোটবড় মিলিয়ে ৩৪টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। আর র‌্যাবের হিসাব অনুযায়ী কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি। এরা শুধু যে অন্যের উপর অপরাধ করছে তাই নয়। কখনো কখনো নিজেরাও একে অপর গ্যাংয়ের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে মারামারি খুনোখুনি পর্যন্ত করছে।

দেশের কিশোর গ্যাং নিয়ে পুলিশ প্রতিবেদন তৈরি করেছিল ২০২২ সালের শেষ দিকে। এতে বলা হয়েছে, সারাদেশে অন্তত ১৭৩টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। বিভিন্ন অপরাধে এদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ৭৮০টি। এসব মামলায় আসামি প্রায় ৯০০ জন। রাজধানীতে কিশোর গ্যাং রয়েছে ৬৬টি। চট্টগ্রাম শহরে আছে ৫৭টি। মহানগরের বাইরে ঢাকা বিভাগে রয়েছে ২৪টি গ্যাং।

বেশিরভাগ বাহিনীর সদস্য ১০ থেকে ৫০ জন। মজার ব্যাপার হলো, গাঙচিল, ডিসকো বয়েজ, নাইনস্টার গ্রুপ ইত্যাদি বাহারি সব নামের এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা সবাই কিন্তু কিশোর নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গ্যাংয়ের নেতৃত্বে থাকেন প্রাপ্ত বয়স্করা। এদের পেছনে আবার মদদ দেওয়ার অভিযোগ স্থানীয় সরকার পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের।

এসব গ্যাংয়ের সবার সরাসরি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকে না। তবে সবাই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকে। অর্থাৎ সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী কিংবা সমর্থক না হলেও রাজনৈতিক মিছিল মিটিংয়ে অংশ নেয় তারা। নেতার পক্ষে স্লোগান দেয়। শোডাউন করে। বিনিময়ে নেতার কাছ থেকে অপরাধ অপকর্মের প্রশ্রয় আশ্রয় পায়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের কিশোরেরা এমন অপরাধ মনোবৃত্তির মানুষ হয়ে গেল কেন? কেউ বলেন, বিশ্বায়নের প্রভাব। কারও মতে শহুরে জীবনে খেলার মাঠ কমে যাওয়া, পাড়ামহল্লা ভিত্তিক সাংস্কৃতিক-সাহিত্যিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়াসহ আরও নানা কারণ। তবে এসবের পাশাপাশি আরও একটা আরও কিছু বিষয় আমি উল্লেখ করতে চাই।

বলছিলাম কিশোর গ্যাংয়ের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ার কথা। একটা সময় ছিল রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা অনেকেই পেশাদার গুণ্ডাপাণ্ডা পালতেন। এখনো হয়তো পালেন কেউ কেউ। এসব গুণ্ডাপাণ্ডা পালতে গিয়ে খরচও নিশ্চয় কম না। কিন্তু এদের থেকে কিশোর বয়সী ছেলেদের পেছনে খরচ কম।

তাদের অল্প কিছু টাকাপয়সা কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে শুধু মাথায় হাত রাখলেই চলে। অর্থাৎ কম খরচে কিংবা বিনা খরচে এদের নিয়ে অনেককিছু করা সম্ভব। তা হোক মিছিল মিটিংয়ে লোক আনা, কিংবা টেন্ডার বাণিজ্যে অথবা দখলদারিত্ব চালু রাখা। আর কিশোরের কখনো এই বয়সের স্বভাবগত অ্যাডভেঞ্চার থেকে, কখনো অভাব অনটন থেকে, আবার কখনো অল্প বয়সে বখে যাওয়ায় একেকজন হয়ে ওঠে পেশাদার অপরাধী।

শুরুতে একটা গল্প বলছিলাম। ২২ বছর বয়সী পাভেলকে হত্যা করে থানায় হাজির হয়েছিল এক কিশোর। সেই কিশোরের বোনকে উত্ত্যক্ত করতো হত্যার শিকার হওয়া পাভেল। পরে তার বোনের সঙ্গে বন্ধুত্বও হয়েছিল পাভেলের। এক পর্যায়ে তার আরেক বড় বোনের মেয়ে (ভাগ্নি)-এর সঙ্গেও একই রকম সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করে। রাস্তাঘাটে দেখা হলে এসব নিয়ে অভিযুক্ত কিশোরের সঙ্গে হাসি ঠাট্টাও করতো সে।

এসবে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে পাভেলকে খুন করে সে। শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাতে ধরা পড়ে সে। গ্রেফতারের পর গোয়েন্দা পুলিশের অফিসে ছেলেটার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল আমার। নিষ্পাপ শান্ত চেহারার একটা ছেলে। খুব সুন্দর ছবি আঁকে! কাগজ কেটে ফুল, ফল, পাখি বানায়।

এখন এই যে, এই ছবি আঁকিয়ে এই ছেলেটা খুনি হয়ে গেল। অপরাধীর খাতায় উঠে গেল তার নাম, এই দায় কার? শুধুই কি ছেলেটির?

আমাদের কিশোরেরা সব সুন্দর হোক। ফুল হয়ে ফুটুক তার ভেতরের অঙ্কুরগুলো।

খান মুহাম্মদ রুমেল ।। গণমাধ্যমকর্মী


আপনার মতামত লিখুন :
এ জাতীয় আরও খবর