• মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ০৫:৩৫ পূর্বাহ্ন

শিলাবৃষ্টি কেন হয়?

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : মঙ্গলবার, ২ এপ্রিল, ২০২৪

গত রোববার রাতে সিলেটে কালবৈশাখী ঝড়ের সাথে যে আকারের শিলাবৃষ্টি হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। স্থানীয়দের দাবি এতো বড় আকারের শিলাবৃষ্টি খুব কমই দেখেছেন তারা। তবে আবহাওয়াবিদরা এটাকে স্বাভাবিক আকার হিসেবেই ভাবছেন।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত এই মৌসুমে এ ধরনের শিলাবৃষ্টি স্বাভাবিক। হাফ ইঞ্চি ডায়ামিটারের শিলার আকারও স্বাভাবিক বলে মনে করছেন তারা।

আকাশে যখন মেঘের পরিমাণ অনেক বেশি হয় বা মেঘ অনেক বেশি ভারি হয়ে ওঠে, তখন বৃষ্টির সময় আকাশ থেকে বরফের টুকরা বা মেঘের কণা পড়ে থাকে একেই শিলাবৃষ্টি বলা হয়ে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিভিয়ার স্টর্মস ল্যাবরেটরির ওয়েবসাইটে শিলাবৃষ্টি সম্পর্কে বলা হয়েছে, শিলাবৃষ্টি হল কঠিন বরফের সমন্বয়ে এক প্রকার বৃষ্টিপাত। যা বজ্র-ঝড়ের উর্ধ্বমুখী স্রোতের ভেতরে তৈরি হয়।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, চৈত্রের শেষ ও বৈশাখের শুরুতে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা বায়ুর প্রভাবে কালবৈশাখী হয়। তখন বাতাসে এক ধরনের উর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি হয়।

সে কারণেই কালবৈশাখী ঝড় হয়। আর এর বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দমকা হাওয়া, বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাত রয়েছে। এই কালবৈশাখী ঝড়ের বৈশিষ্ট্যের জন্যই শিলা বৃষ্টি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ওই ওয়েবসাইটে আরও বলা হয়েছে, বাড়িঘর, গাড়ি এমনকি মানুষের মৃত্যুর কারণ ও হতে পারে শিলাবৃষ্টি।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্টর্মস ল্যাবরেটরির ওয়েবসাইটে শিলা গঠন সম্পর্কে বলা হয়েছে, যখন বৃষ্টির ফোঁটা বজ্রঝড়ের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের অত্যন্ত ঠাণ্ডা জায়গায় ঊর্ধ্বমুখী হয় এবং জমাট বাঁধে তখন শিলাবৃষ্টি তৈরি হয়।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিলাবৃষ্টির প্রধান শর্ত প্রচণ্ড গরম। বাংলাদেশে চৈত্র-বৈশাখ মাসে এ রকম গরম পড়ে। ফলে মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে যে কালবৈশাখী ঝড় হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই শিলাবৃষ্টি হয়। এ সময় ভূ-পৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুমণ্ডলের কোথাও কোথাও ৩৪ থেকে ৩৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে। ওই সময় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দখিনা বাতাস আসতে পারে। তার সঙ্গে যোগ হয় বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের তাপীয় লঘুচাপ। একইসাথে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্পে পূর্ণ আর্দ্র বাতাস যুক্ত হয়।

এই দুটির সাথে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা অপেক্ষাকৃত শীতল বাতাসের সংমিশ্রণে মেঘমালা তৈরি হয়। এগুলো ভূ-পৃষ্ঠের তিন কিলোমিটার উপর থেকে আরও ১৮ থেকে ২২ কিলোমিটার পর্যন্ত উপরে উঠে যায়। জলীয় বাষ্প উপরে উঠে আরও ঠাণ্ডা হয়ে যায় এবং ছোট ছোট বরফ কণায় পরিণত হয়।

এই ছোট ছোট বরফ কণা আশে পাশের আরও বরফখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং শিলাখণ্ডে পরিণত হয়। শিলাখণ্ড যখন বেশি ভারি হয়ে যায় তখন এর ওজনকে আর বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে পারে না। তখন এগুলো শিলাবৃষ্টি আকারে ভূ-পৃষ্ঠে নেমে আসে।

সিলেটের শিলাবৃষ্টি কি স্বাভাবিক আকারের?
সিলেটের এই শিলাবৃষ্টি কি স্বাভাবিক আকারের এ প্রসঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলছেন, সিলেটে যে আকারের শিলাবৃষ্টি হয়েছে তা স্বাভাবিক বলে মনে করছেন।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এর আগে ২০১৫ সালে সাতক্ষীরায় শিলাবৃষ্টিতে পাঁচ হাজার পাখি মারা গেছে। আমাদের আরো অনেক রেকর্ড আছে”।

“সাধারণত হাফ ইঞ্চি পর্যন্ত হয় শিলাবৃষ্টির সাইজ। সাধারণত এক থেকে একশ গ্রাম পর্যন্ত হয় এর আকার” জানিয়ে সিলেটের শিলাবৃষ্টি স্বাভাবিক আকারের বলে মনে করছেন তিনি।

বাংলাদেশে বিশেষ করে নওগাঁ, সাতক্ষীরা, রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট,মাদারীপুর, ফরিদপুর, ঢাকা এসব এলাকায় মার্চ, এপ্রিল, মে মাসে এমনকি জুন – জুলাই মাসেও বজ্রমেঘ তৈরি হয়ে শিলাবৃষ্টি হয় বলে জানান মি. মল্লিক।

সিলেট বিভাগের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “শিলা বৃষ্টির সাইজ যে কোন আকারের হতে পারে। এর চেয়ে বড় শিলাবৃষ্টিও হয়। রোববার হাফ ইঞ্চি ব্যাসার্ধে এক ইঞ্চি বৃত্ত আকারের শিলা রেকর্ড করা হয়েছে ”

তিনি বলেন, “মার্চ, এপ্রিল, মে এই সিজনে এ রকম হয়”।

“সিলেট অঞ্চলে বেশি হয় কারণ পাহাড় অধ্যুষিত এলাকা। এ ধরণের এলাকায় উত্তর পশ্চিম থেকে যখন মেঘগুলো আসে তখন পাহাড়ি বাতাস ও অঞ্চলের সাথে সমন্বয় ঘটে শিলাবৃষ্টি বা বজ্রপাতের প্রবণতা এ অঞ্চলে বেড়ে যায়” বলেন মি. হোসাইন।

এই আবহাওয়াবিদ জানান, মার্চ মাস থেকে মে এই তিন মাসকে প্রাক-মৌসুম বলা হয়। এই তিন মাস একই রকমের আবহাওয়ার পূর্বাভাস করা হয়।

“আবহাওয়ার পূর্বাভাস এই তিন মাস এই রকমই থাকতে পারে। সেটা বিক্ষিপ্তভাবে, অনবরত না। বিক্ষিপ্তভাবে দুই একদিন পর পর থেমে থেমে এই রকমই হতে পারে” বলেন মি. সজিব হোসাইন।

“যখন হবে কাছাকাছি, হয়তোবা শিলা হতেও পারে নাও হতে পারে। এই প্যাটার্নই মে মাস পর্যন্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ফিক্সড করা প্যাটার্ন” জানান মি. হোসাইন।

শিলাবৃষ্টির আকার কীভাবে নির্ধারণ হয়?
আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, “হিমাঙ্ক থেকে মাইনাস ৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত যেসব শিলাকণা তৈরি হয়, তার সাইজ যদি ক্লাউড টপ থেকে নিচের দিকে ধাবিত হয় হিমাঙ্ক রেখা বরাবর তখন ওই শিলার সাইজ বড় হয়। কারণ তাপমাত্রা নেগেটিভ”।

“আবার হিমাঙ্ক রেখা পার হওয়ার পর শিলাবৃষ্টির সাইজ ছোট হতে থাকে। কোন কোন সময় ছোট ছোট হতে হতে বায়ুমণ্ডলেই বিলীন হয়ে যায়। অর্থাৎ ভূ–পৃষ্ঠে পড়ে না” বলেন মি. মল্লিক।

হিমাঙ্ক রেখা হলো যেখান থেকে বাতাসের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে নেমে যায়। ক্লাউড টপ হলো মেঘের দৃশ্যমান অংশের সর্বোচ্চ উচ্চতা।


আপনার মতামত লিখুন :
এ জাতীয় আরও খবর