• বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ১০:৪০ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের চিকিৎসা খাত নিজেই অসুস্থ

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট : শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

কিছুদিন আগে আমি লিখেছিলাম, তবে কি বাংলাদেশের মানুষ এখন খতনার জন্যও বিদেশ যাবে? তখন অনেকে বলেছিলেন একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে এত বড় মন্তব্য করা যাবে না। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে একই ঘটনার জন্ম দেন মালিবাগের জে এস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল চেকআপ সেন্টারের চিকিৎসকরা। খতনা করাতে গিয়ে অ্যানেসথেশিয়ার বাড়তি মাত্রায় মারা যায় নামে আহনাফ তাহমিদ আয়হাম নামের এক শিশু।

আয়ান আহমেদ থেকে আয়হাম- এ দুই শিশুর মৃত্যুর দূরত্ব মাত্র ৪৪ দিন। মৃত্যুর কারণও অভিন্ন। খতনা করাতে গিয়ে অতিরিক্ত অ্যানেসথেশিয়া। রাজধানীর ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকের অবহেলা ও গাফিলতিতে গত ৭ জানুয়ারি যখন শিশু আয়ানের জীবন আলো নিভে যায়, তখন প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছিল অনেকেই। এখন আবার একই রকম ঘটনা ঘটলো।

মিল আরও আছে। জে এস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল চেকআপ সেন্টারে খতনা কিংবা অ্যানেসথেশিয়া প্রয়োগেরই অনুমোদন ছিল না। অভিযুক্ত দুই চিকিৎসকের বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধনও নেই। ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটিরও নিবন্ধন ছিল না।

প্রচুর চিকিৎসক আছেন, যারা পেশাকে বিকিয়ে দিয়েছেন ওষুধ কোম্পানি, হাসপাতাল আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কমিশনের কাছে। চিকিৎসকরা ধনী হোন, কিন্তু সে জন্য যদি অস্বচ্ছ পথে মানুষের দুর্বলতম, অসহায়তম মুহূর্তগুলোকে বিকৃতভাবে ব্যবহার করা হয়, সেটা অপরাধ। বিএমডিসি কি কিছু ভাববে?

একটা দুইটা ভুল চিকিৎসার খবর এলেই এসব খবরে পত্রিকার পাতা ভরে যায় কারণ তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নড়ে চড়ে বসে। অধিদপ্তর এই অনুমোদনহীন ক্লিনিক, সেন্টার বা হাসপাতালের পরিসংখ্যান দেয়, আমরাও লেখালেখি ও বলাবলি করি। এরপর সবাই আরেকটি ঘটনা ঘটা পর্যন্ত অপেক্ষা করি। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকে বলে আসছেন যে, অনুনোমোদিত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করতে হবে। আমরা দেখি সেটা হয় কিনা।

সারাদেশের বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার দেখভালের দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নিলে চিকিৎসাকেন্দ্র পরিচালনার সুযোগ মেলে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বড় দায়িত্ব নজরদারি করা। এবং সেটা করছে না বলেই অবৈধ চিকিৎসাকেন্দ্র, হাসপাতালে দেশ ছেয়ে গেছে।

সারাদেশে লাইসেন্সধারী বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্ল্যাড ব্যাংক আছে ১৫ হাজার ২৩৩টি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চালু আছে অর্ধ লক্ষাধিক। ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা এসব হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অবকাঠামো এবং চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মী সব বিষয়ে বড় ঘাটতি নিয়ে চলছে। চিকিৎসক-নার্স-টেকনোলজিস্ট তো দূরের কথা, ভুয়া ডিগ্রির লোকজন দিয়ে এসব অবাধে চলছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মাঝে মাঝে অভিযানও চালায়, তারপর আবার সব আগের জায়গায় ফিরে যায়।

সরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগীর চাপ, দালালদের অত্যাচার, দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে চিকিৎসা ব্যয় বেশি হলেও হয়রানি কম বলে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সারাবছর রোগীদের ভিড় লেগেই থাকে। তবে বেসরকারি হাসপাতালগুলোও কসাইখানা ছাড়া আর কিছু নয়। প্রয়োজনের তুলনায় কম জনবল, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনাসহ নানা কারণে বেসরকারি হাসপাতাল থেকেও রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছে না। অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিক নিয়ন্ত্রণে আসা যাচ্ছে না কোনোভাবেই।

সংখ্যায় হাসপাতাল, ক্লিনিক আর ডায়াগনস্টিক সেন্টার অনেক। কিন্তু চিকিৎসা বলে তেমন কিছু গড়ে উঠেনি। বলতে গেলে বাংলাদেশের চিকিৎসা খাত নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সরকারি চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে একটি স্বাভাবিক অভিযোগ যে তারা হাসপাতালে থাকেন না, গ্রাম পর্যায়ে আরও বেশি থাকেন না। ঢাকার বাইরে থাকা ডাক্তাররা সরকারি বেতন নিচ্ছেন, আবার সেই সময়টায় ঢাকার কোনও প্রাইভেট হাসপাতালে বড় অংকে কাজ করছেন, কিংবা নিজে প্রাইভেট রোগী দেখছেন বা অন্য কোনও কাজ করছেন। আরেকটি বড় আভিযোগ হল ভুল চিকিৎসা।

চিকিৎসা ভুল হয়েছে না ঠিক হয়েছে সেটা নির্ণয় করা কঠিন। হাসপাতালে রোগী বাঁচার জন্যই যায়। আর এ কথাও আমরা বিশ্বাস করি, ইচ্ছে করে নিশ্চয়ই কোনও চিকিৎসক রোগী মেরে ফেলতে চাইবেন না। তবে এই পেশায় যে চিকিৎসকের উদাসীনতা বা অবহেলা নেই সেটাও বলা যাবে না। দেশের চিকিৎসক সমাজ সম্পর্কে একটা ধারণাগত অসঙ্গতি অনেক দিনে তৈরি হয়েছে।

মানুষ মনে করেন রোগীর সেবার বদলে নিজেদের পকেটের সেবা করেন ডাক্তাররা। মানুষ অভিযোগ করবে, গণমাধ্যম প্রতিবেদন করবে, সরকারি পর্যায় থেকেও নানা কথা বলা হবে এবং চিকিৎসক সমাজ তা ক্রমাগত অস্বীকার করে যাবে, এমনটাই চলছে। বাংলাদেশের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে একটি অঙ্গ ধরলে, বলতেই হবে সেই একই অঙ্গে বহু রোগ জমেছে।

চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার অভিযোগ উঠলে তদন্ত ও বিচারের দায়িত্ব বিএমডিসির। চিকিৎসকের পেশা চর্চার অনুমতিও দেয় সংস্থাটি। অসদাচরণ, অবহেলা বা ভুলের কারণে রোগীর ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের নিবন্ধন বাতিলও করতে পারে তারা। কিন্তু বিএমডিসি চিকিৎসকদের দোষ পায় না। একটি পত্রিকা জানিয়েছে, বিএমডিসিতে গেল এক যুগে ২৬৮টি অভিযোগ জমা পড়ে।

সর্বোচ্চ শাস্তি একজন অভিযুক্ত চিকিৎসকের নিবন্ধন বাতিল এবং ১২ চিকিৎসকের বিভিন্ন মেয়াদে নিবন্ধন স্থগিত করা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব নিবন্ধন স্থগিত করা হয় তিন মাস থেকে সর্বোচ্চ এক বছর। হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও অনেকেই অভিযোগ করেন না। প্রথমত, মানুষ এসব বিষয়ে খুব বেশি জানেন না। আবার যারা জানেন, তাদের ৯০ শতাংশ বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে ঘটনা মিটিয়ে ফেলেন।

তবে অবশ্যই ভাল চিকিৎসক আছেন। যেসব চিকিৎসক নিজেদের বিকিয়ে দেননি, নিজের প্রতি, নিজের পেশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল রয়েছেন, তারাও কিছু বলছেন না। ফলে দুষ্কর্মের পরিধি প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু প্রচুর চিকিৎসক আছেন, যারা পেশাকে বিকিয়ে দিয়েছেন ওষুধ কোম্পানি, হাসপাতাল আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কমিশনের কাছে। চিকিৎসকরা ধনী হোন, কিন্তু সে জন্য যদি অস্বচ্ছ পথে মানুষের দুর্বলতম, অসহায়তম মুহূর্তগুলোকে বিকৃতভাবে ব্যবহার করা হয়, সেটা অপরাধ। বিএমডিসি কি কিছু ভাববে?

 

লেখক:সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রধান সম্পাদক, গ্লোবাল টেলিভিশন।


আপনার মতামত লিখুন :
এ জাতীয় আরও খবর