এই দিন

মঙ্গলবার   ১৪ জুলাই ২০২০   আষাঢ় ৩০ ১৪২৭   ২৩ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beta Version
   এই দিন
সর্বশেষ:
দেশের স্বাস্থ্যখাতে কোথাও কোন সিন্ডিকেট নেই: স্বাস্থ্যমন্ত্রী করোনায় গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩৩ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ৩১৬৩ এবছর সিপিজের অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন বাংলাদেশের আলোকচিত্রী শহিদুল আলম হাটে হাটে উঠেছে গরু, নেই ক্রেতা দুই সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ শুরু
৬৯

সুশাসনের ভিত্তিতে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করতে হবে

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ মে ২০২০  

শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। অর্থনীতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারী হোসেন জিল্লুর রহমান দারিদ্র্য, প্রশাসন, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, নগরায়ণ এবং রাজনৈতিক বিকাশের বিষয়ে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ের একজন নীতিনির্ধারক। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগ, ডেনিস আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, সুইডিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা, টেকসই উন্নয়ন কমিশন, অ্যাকশন এইড, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংস্থার পরামর্শদাতা ছিলেন। সম্প্রতি কভিড-১৯-এর কারণে সম্ভাব্য বৈশ্বিক মন্দা, পিপিআরসি-বিজিআইডি (ব্র্যাক)-এর যৌথ গবেষণা, ব্যাংক খাতের দুরবস্থাসহ নানা বিষয়ে তিনি একটি গণমাধ্যমে মুখোমুখি হন। 

গণমাধ্যম: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ ও আর্থিক সেবাদাতা বহুজাতিক কোম্পানি মরগ্যান স্ট্যানলি বলছে যে, কভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসের কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার দিকে যাচ্ছে। এ মন্দা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর কতটা বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে? মন্দা মোকাবিলায় সরকার আর্থিক খাতে কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে?

হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনৈতিক মন্দার সম্ভাবনা সাধারণ অর্থে খুবই বাস্তব। মরগ্যান স্ট্যানলি যে পূর্বানুমান করেছে সেটা অনেকেই করছে। তবে বাংলাদেশের মতো দেশের যেটা প্রয়োজন, সেটা হলো এ মন্দা এ দেশের পরিপ্রেক্ষিতে কতটা বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে, তার একটি তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রণয়ন। সাধারণভাবে একটা মন্দা হচ্ছে, এটাকে অতিক্রম করে আমাদের এখন দ্বিতীয় ধাপে যাওয়া দরকার। সেটা হলো সিনারিও এক্সাসাইজ। কী হতে পারে তার তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ। আমাদের প্রবৃদ্ধির দুটি চালক আছে। সেগুলো হলো তৈরি পোশাক খাত এবং প্রবাসী আয়। কভিড-১৯-এর ফলে দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে কতদূর পুনরুদ্ধার করা যাবে, সেটা দেখবার বিষয় আছে। প্রবাসী আয়ের বিষয়টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ভবিষ্যতে আরও হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে আমাদের সুযোগটা শুধু কমে যাচ্ছে, তা নয়। এ মুহূর্তে যারা কাজ করছে, তাদের বৃহৎ অংশকেও ফেরত পাঠানোর মতো আশঙ্কা রয়েছে। তার অর্থ আমাদের বৈদেশিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক নানামুখী সমস্যার মধ্যে পড়তে পারে। অভ্যন্তরীণভাবেও লকডাউনের কারণে আমাদের সেবা খাতগুলোও স্থবির হয়ে আছে। তাই বৈশ্বিক মন্দার যে আশঙ্কা রয়েছে, সেখান থেকে পলিসি রেসপন্সের যে আইডিয়া সেটা তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে করতে হবে। বৈশ্বিক মন্দা আমাদের কীভাবে আক্রান্ত করবে, সেখান থেকে আমাদের কী ধরনের সুযোগ তৈরি হতে পারে, সেটাও নির্ধারণ করতে হবে। আমাদের জন্য সুযোগও তৈরি হতে পারে। জাপান যদি চীন থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নেয়, সে তখন অন্য কোথাও খুঁজবে। সে ক্ষেত্রে আমরা সেই সুযোগ নিতে পারি কি না, তার সম্ভাবনাও কিন্তু থাকবে। তাই শুধু চায়ের টেবিলে বিষয়টি সীমাবদ্ধ না রেখে, আমাদের পলিসি রেসপন্স কী হতে পারে, তার জন্য দক্ষ ও শক্তিশালী বিশ্লেষণ তৈরি করতে হবে। আমাদের সক্ষমতার বিষয়টিও নিরূপণ করতে হবে। প্রবাসী আয়ের সম্ভাবনা যদি কমে যায়, তাহলে আমাদের বিকল্প খুঁজতে হবে। সার্বিকভাবে এরকম চিন্তাভাবনা করাটা আমাদের জন্য অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে।

 

গণমাধ্যম: গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) করা এক জরিপে বলা হয়েছে, শহুরে দরিদ্র মানুষদের আয় গত ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় ৮২ শতাংশ কমে গেছে। আর গ্রামের দরিদ্র মানুষের আয় কমে গেছে ৭৯ শতাংশ। তিন ধরনের দরিদ্রশ্রেণির আয় গড়ে ৭৬ শতাংশ কমে গেছে। এ শ্রেণির মানুষদের জন্য সরকার কী ধরনের সহায়তা কর্মসূচি নিতে পারে?

হোসেন জিল্লুর রহমান: পিপিআরসি এবং বিআইজিডির যে গবেষণা সেটা এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি করা হয়। কভিড-১৯-এর শুরুতে অর্থনৈতিকভাবে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সে আলোচনা হচ্ছিল, তার মধ্যে শক্তিশালী অর্থনৈতিক লবি, যেমন আরএমজি লবি, বিজেএমই লবির কথাই বেশি শোনা যাচ্ছিল। তারা কিন্তু সরকার থেকে আদায়ও করে নিয়েছিল। তখন কিন্তু যারা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং রাজনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন, তারা কিন্তু তাদের চাহিদার কথা বলতে পেরেছিল। আমরা এ গবেষণাটা করেছিলাম, যারা অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র এবং যাদের কণ্ঠস্বর দুর্বল, তাদের জন্য। এখানে দুটি জিনিস উঠে এসেছে। একটি হলো, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়ে একটা ব্যাপক ধস নেমেছে। ফেব্রুয়ারির তুলনায় তাদের আয় ৭৬ শতাংশ কমে গেছে। তার অর্থ এরা হঠাৎ করে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়ে গেছে। আরেকটি বিষয়ও উঠে এসেছে। সেটি নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের আরও চিন্তাভাবনা করা উচিত। আমাদের দারিদ্র্যসীমার নিচে কত শতাংশ বাস করে? বলা হয়ে থাকে, ২০ শতাংশ। আমাদের ধারণা, এ সীমার ওপরে যারা থাকে, তারা আরামে বসবাস করে। আসলে এ পরিস্থিতিতে আমাদের গবেষণা বলছে, এরাও বিপদে পড়ে গেছে। এটা প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি। এরাও কিন্তু এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে গেছে। আমরা এদের বলছি নতুন দরিদ্র। দরিদ্র এবং নতুন দরিদ্র জনগোষ্ঠী যে বিপদের মধ্যে পড়ে গেছে, সেটা আমরা গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরেছি। আমরা গবেষণার মাধ্যমে সরকারকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। পলিসি রেসপন্সের জন্য যে কর্মসূচিগুলো আছে, যেসব দুর্যোগ মোকাবিলার কর্মসূচি রয়েছে, সেগুলো মূলত গ্রামীণ দরিদ্রদের জন্য। শহুরে দরিদ্রদের জন্য তেমন কোনো কর্মসূচি নেই। এবারের ধাক্কায় শহুরে দরিদ্রদের জন্য সরকার কিছু কর্মসূচি নিলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। এদের জন্য আরও সহায়তা কর্মসূচি দরকার। বিশেষ করে, নতুন দরিদ্রদের জন্য এটা আরও বেশি দরকার। আর এখানে সুশাসনের বিষয়টি জড়িত। বরাদ্দ প্রণয়ন করলেই হবে না, যার কাছে পৌঁছানোর কথা, তার কাছে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তার মানে এখানে তালিকা তৈরির বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে করতে হবে, আবার বিতরণের বিষয়টিও সুষ্ঠুভাবে করতে হবে। সার্বিকভাবে পলিসি রেসপন্সটা এভাবে আসা উচিত।

 

গণমাধ্যম: কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণ থেকে প্রাপ্ত সুদ এবং বিভিন্ন ধরনের ফি আর কমিশন থেকে যে বড় আয় হয়, তা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে তারা ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে। ব্যাংক খাতের এ বিপর্যয় থেকে কীভাবে উত্তরণ সম্ভব?

হোসেন জিল্লুর রহমান: ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা আমাদের কভিড-১৯-এর আগেও ছিল। সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাত ভয়াবহ সুশাসনের ঘাটতির শিকার। রাজনৈতিকভাবে যারা ক্ষমতাসম্পন্ন, তারা ঋণখেলাপি হয়ে ব্যাংক মালিকদের মধ্যে বসে আছে। কিছুটা চাপে পড়ে সরকার কিছু নিয়ম করেছিল। কিন্তু কভিড-১৯-এর কারণে পরিস্থিতি আবার বেসামাল হয়ে পড়েছে। আমরা গার্মেন্টস খোলা রেখেছি, কিন্তু ব্যাংকগুলোকে পুরোপুরি খোলা রাখছি না। এখানে সামাজিক দূরত্ব মেনেই স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা দরকার। প্রকৃত অর্থে, জনগণ বড়ভাবেই ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এখানে আরও একটি কথা বলা দরকার। সেটি হলো, তারা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এদের অধিকাংশই ব্যাংকের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। এ প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর আকার দেখে খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু এর সঙ্গে যদি সুশাসন যুক্ত না করা যায়, তাহলে উল্টো ঘটনা ঘটবে। বরাদ্দ হলো, কিন্তু তা ঋণখেলাপি এবং ক্ষমতাবানদের কাছে গেলে মুশকিল। উল্টোটা ঘটার আশঙ্কা এই অর্থে যে, ৩০ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ, সেখানে ঋণখেলাপিদের ব্যাপারে নানা সীমাবদ্ধ আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন আগে এক সার্কুলারে দেখলাম যে, এ সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে কিছুটা শিথিলতা আনা হয়েছে। এটা কিন্তু আমাদের জন্য অশনিসংকেত। আমাদের সুশাসনের ভিত্তিতে প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।

 

গণমাধ্যম: করোনা শনাক্তের জন্য নমুনা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সম্প্রতি সরকার বুথ স্থাপনের দায়িত্ব ব্র্যাককে দিয়েছে। ব্র্যাকের চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারের নমুনা সংগ্রহের কাজে প্রতিষ্ঠানটিকে যুক্ত করার এ উদ্যোগকে কীভাবে দেখছেন? আরও অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন?

হোসেন জিল্লুর রহমান: বুথের মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ একটা গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন। এটা আবিষ্কার করেছে ভারতের কেরালা প্রদেশ। আমাদের দেশে যে পরিমাণ পরীক্ষা হওয়া দরকার, তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ এখানে হচ্ছে। এই যে আমরা কম পরীক্ষার মধ্যে আটকে আছি, তার অন্যতম একটা প্রধান কারণ হচ্ছে, নমুনা সংগ্রহ। এখানে সরকার প্রথম থেকেই লাল ফিতার মাইন্ডসেটে বিষয়টা অ্যাপ্রোচ করেছে। সরকার প্রথমে আইইডিসিআরকে একমাত্র এ দায়িত্ব দিয়েছিল, পরে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক ধরনের আমলাতান্ত্রিক মাইন্ডসেটে ছিল। এখন বুথ স্থাপনের যে সিদ্ধান্ত সেটা একটা শুভ উদ্যোগ এবং পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কারণ নমুনা সংগ্রহের বিষয়টি যদি আমরা বাড়াতে পারি, তাহলে পরীক্ষার পরিমাণও বাড়াতে পারব। ইতিমধ্যে ব্র্যাক ৫০টির মতো বুথ স্থাপন করেছে। তবে এখানে বলা দরকার যে, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জের মতো হটস্পটগুলোতেই বুথ স্থাপনের কাজ সর্বাধিকার পাওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতা বিবেচনা করে আরও প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা যেতে পারে।

   এই দিন
এই বিভাগের আরো খবর