এই দিন

বৃহস্পতিবার   ০৪ জুন ২০২০   জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪২৭   ১২ শাওয়াল ১৪৪১

Beta Version
সর্বশেষ:
ভবনে বহিরাগতদের প্রবেশ সীমিত করেছে ডিএনসিসি রোগীদের সেবা নিশ্চিত না হলে আন্দোলন : ছাত্রলীগ জুন থেকে গার্মেন্টস শ্রমিক ছাটাই শুরু হবে: রুবানা হক মানুষকে সুরক্ষিত করতে প্রাণপণে চেষ্টা করছি: প্রধানমন্ত্রী জামালপুর- ২ আসনের সংসদ সদস্য ফরিদুল হক করোনায় আক্রান্ত সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে শনাক্ত আড়াই হাজার, মৃত্যু ৩৫ জনের বাংলামোটরে বিহঙ্গ বাসের ধাক্কায় নিহত ২
৬৭০

সাংবাদিক মরলে আসলেই কিচ্ছু হয় না!

ইমতিয়াজ মেহেদী হাসান

প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল ২০২০  

সদা হাস্যোজ্বল খোকন ভাই আর নেই। হ্যাঁ, আমি হুমায়ূন কবীর খোকন ভাইয়ের কথা বলছি। দেখা হলেই যিনি পরমস্নেহে বুকিয়ে জড়িয়ে নিতেন সেই খোকন ভাইয়ের কথা বলছি। করোনাযুদ্ধে প্রথম নিহত সংবাদ সৈনিক তিনি। কর্মরত ছিলেন দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকার নগর সম্পাদক ও  প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে। 

সংবাদকর্মী হওয়ার সুবাদে এর আগে একটি মিডিয়া হাউজে তার সঙ্গে কাজের সুযোগ হয়েছিলো আমার। বন্ধুবৎসল এ সহকর্মী অফিসে ডেস্কে কাজের মুহুর্তে যখন ভীষণ চাপ, পত্রিকার প্রথম কিংবা দ্বিতীয় সংস্করণ ছাড়ার তাড়াহুড়ো-তখন কাঁধে হাত রেখে তিনি বলতেন, কি হিরো খুব প্রেশার যাচ্ছে বুঝি? এরপর তিনি পাশে বসতেন, বলতেন প্রুফ দেখা লাগলে বলো, দেখে দিই। নিউজের হেল্প লাগলে বলো, করি। 

খোকন ভাই, আমি-আপনি দু’জনাই ওই মিডিয়া হাউজ ছেড়েছিলাম। কিন্তু দু’জনকার হৃদ্যতার বন্ধন ছিন্ন হয়নি। বরং আরো দৃঢ় হয়েছিলো। আপনি প্রায়ই ফেসবুকে আমার লেখা স্ট্যাটাস, প্রকাশিত গান কিংবা নির্মাণের প্রশংসা করতেন। অনুপ্রেরণা যুগিয়ে বলতেন, মধ্যবিত্ত হয়ে কাঁধে পরিবারের ভার থাকা সত্ত্বেও তুমি সাংবাদিকতার পাশাপাশি সৃজনশীল পৃথিবীর জন্য যে কাজগুলো করছো, দেখবে তোমাকে এই কাজগুলো একদিন অনেক দূর নিয়ে যাবে।

খোকন ভাই, বিধাতা আমার কর্মগুণ ও চেষ্টায় কতদূর নিয়ে যাবেন জানিনা। তবে আপনি তো কথা না রেখে অনেকদূর চলে গেলেন। অনেকটা দূর। যেখান থেকে চাইলেও কেউ ফিরতে পারেনা। চাইলেও কেউ আমার ডেস্কের পাশে এসে বলবেন না, ইমতিয়াজ সিট থেকে একটু ওঠো। যাও ক্যান্টিন কিংবা নিচ থেকে একটু চা-নাস্তা করে এসে আবার কাজে বসো। এভাবে একটানা বসে কাজ করো না, অসুস্থ হয়ে যাবে।

এই শহরে যে কয়জন অভিভাবক শ্রেণির মানুষ ছিলেন, খোকন ভাই ছিলেন একজন। এ কারণে সর্বদা তিনি খোঁজ-খবর নিতেন। কাজের ফাঁকে মাঝে মধ্যে উঠে এসে বলতেন, নতুন কি লিখছো? সামনে নতুন কি নির্মাণ করবা? গতকাল রাতে (২৮ এপ্রিল) যখন শুনলাম খোকন ভাই সবাইকে ফাঁকি দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তখন অজান্তেই চোখের কোণা গড়িয়ে জল এলো। অনুধাবন করলাম, আমি তো সহজে কাঁদি না। তবে কেন এই অশ্রুজল? পাশ থেকে আরেক সহকর্মী বললেন, ভাই প্রিয়জন বিয়োগে চোখে এমন জল আসে। সব কিছু ভেঙেচুরে দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

সহকর্মী ভুল বলেননি। আচ্ছা খোকন ভাই, আপনি যে এভাবে লোকান্তরিত হয়ে চলে গেলেন, এতো এতো অণুজ-অগ্রজ কিংবা শুভাকাঙ্খীদের রেখে- তাদের এখন কি অবস্থা একবার ভেবেছেন? এমনটা কি করা আপনার একদম ঠিক হয়েছে? আচ্ছা এ প্রসঙ্গে না হয় বাদ দিন, কিন্তু আপনি নিউজ-অফিস-টিম মিটিং এসব ছাড়া ওখানে কিভাবে থাকবেন। ওখানে নিশ্চয় রিপোর্টিং প্যাড হাতে কাজ করার সুযোগ নেই!

এবার আসি ভিন্ন প্রসঙ্গে, দেশের সকল সংবাদ শ্রমিকরা যখন করোনাযুদ্ধে সম্মুখে থেকে দেশবাসীর জন্য লড়ছেন, তখন সংশ্লিষ্ট মিডিয়া হাউজ কর্তৃপক্ষ কি তাদের সুরক্ষা পোশাক নিশ্চিত করেছে? সীমিত জ্ঞানে যতটুকু জানি, অধিকাংশ হাউজই সংবাদকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করেনি। কিন্তু সংবাদকর্মীরা এরপরও দেশসেবায় পিছিয়ে থাকেননি। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এখনো করছেন। অনেকেই হয়তো জানেন না, বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত আমাদের অনেক সহকর্মী এরইমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে তারা সেই সংবাদ গোপন করে রেখেছেন। পরীক্ষা করলে হয়তো এই আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়বে। পৃথিবীর কোথাও করোনায় এত সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়ার খবর অদ্যাবধি পাওয়া যায়নি।

অথচ এসবে মাথাব্যথা নেই সংশ্লিষ্ট মিডিয়া হাউজগুলোর মালিকপক্ষের। তাদের ভাবটা এমন যেন, সাংবাদিক মরলে কী এমন আসে যায়! করোনায় এই সময়ে অনেক মিডিয়া হাউজ আবার সংবাদকর্মীদের বেতনভাতা বন্ধ করে দিয়েছে। মাস পেরনোর পর আবার কেউ কেউ অর্ধেক ভাতা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা নিয়ে শুরু হয়েছে টালবাহানা। আজ না কাল, এভাবে করে মাস পেরিয়ে যাচ্ছে। তবুও বেতন পাচ্ছেন না সংবাদকর্মীরা। আবার অনেকেরতো চাকরিই চলে গেছে। এখন বিভিন্ন পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন পোর্টালের শতাধিক কর্মহীন সংবাদকর্মীদের কি হবে? আরেকটি প্রশ্নবোধক প্রশ্ন, যে সমস্ত মিডিয়া হাউজ মালিকরা সাংবাদিকদের বেতন দিচ্ছেন না, তাদের কি দেয়ার ক্ষমতা নেই? নাকি মানুষকে এই দুর্যোগের মুহুর্তে ঠকিয়েই তারা পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছেন?

আমরা সংবাদকর্মীরা যারা ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঝুঁকির কথা টেলিভিশন-পত্রিকায় প্রতিনিয়ত তুলে ধরি, তাদের সুরক্ষা-নিরাপত্তা দেয়ার বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের নজরে আনি। সেই আমাদের কথা কি আমরা কখনো সেভাবে বলতে পেরেছি? পারিনি। তবে সঙ্গে এটাও হতাশাব্যঞ্জক খবর হচ্ছে, যথাযথ কর্তৃপক্ষ আমাদের নিয়েও ভাবেননি। উল্টো তারা শুকনো ধন্যবাদ দিয়েই নিজেদের দায় সেরেছেন।  এবং এখনও চাইছেন।

আসলে সাংবাদিকদের জন্য কেউ নেই, থাকলে আজ আমাদের অবস্থাটা এমন হতো না। আমরা কেবল পেশাগত জায়গা ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের সমস্যা নিয়ে বলে যাবো। পোশাক শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনার দাবিতে আমরা টিভিতে লাইভ করবো, পত্রিকায় গোটা গোটা অক্ষরের শিরোনামে তাদের অধিকার আদায় নিয়ে নিউজ লিখবো৷ অন্যায়ভাবে কারো চাকরি গেলে একের পর এক নিউজ করবো। পক্ষান্তরে এই আমরা যারা সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে আলোর সামনে আনি, সেই আমরাই থেকে যাচ্ছি অন্ধকারে। অর্থাৎ বাতির নিচে নিরেট অন্ধকারে।  

সবশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আকুল আবেদন, আপনি আমাদের শেষ ও নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল। অনুগ্রহপূর্বক আপনি আমাদের দায়িত্ব নিন। জাতির জাগ্রত বিবেক সাংবাদিক সমাজের আইসিউইউতে থাকা জীবনযাত্রা থেকে মুক্তি দিন। শুধু আপনিই পারেন, আপনিই পারবেন। কারণ আপনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

   এই দিন
এই বিভাগের আরো খবর