এই দিন

বুধবার   ২১ অক্টোবর ২০২০   কার্তিক ৬ ১৪২৭   ০৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

Beta Version
   এই দিন
সর্বশেষ:
দেশে ফেরামাত্র পি কে হালদারকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ হাইকোর্টের করোনায় নতুন শনাক্ত ১৫৪৫, মৃত্যু ২৪ মাধ্যমিকে বার্ষিক পরীক্ষা বাতিল সাগরে লঘুচাপ, বন্দরগুলোতে ৩ নম্বর সর্তক সংকেত শারদীয় দুর্গোৎসব আজ বোধন
১০১

কক্সবাজারে বিপৎসংকুল ২২ কি.মি.সড়ক

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২০  

কক্সবাজার সদর উপজেলার ঈদগাঁও থেকে রামু উপজেলার ঈদগড় পর্যন্ত মাত্র ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক। সন্ধ্যা নামার আগেই যানবাহন ও লোক চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এই সড়কে। সকাল ৮টার আগে সড়কে কোনো গাড়ি নামে না। এক দশক ধরে এই সড়ক চলছে এই নিয়মে- এর পরও থামছে না ডাকাতি, খুন ও অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের মতো ভয়াবহ সব অপরাধ।

সম্প্রতি যাত্রীবাহী একটি অটোরিকশায় হামলা চালিয়ে কক্সবাজারের জনপ্রিয় শিশুশিল্পী জনি রাজকে কুপিয়ে হত্যার পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে এই সড়ক। জনি হত্যার প্রতিবাদে এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের দাবিতে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় অধিবাসীরা। প্রতিবাদ মিছিল, বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে জেলাব্যাপী।

সবচেয়ে বেশি ডাকাতি হাটের দিনে : কক্সবাজার সদর উপজেলার ঈদগাঁও থেকে রামু উপজেলার ঈদগড় ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের দুই লাখ মানুষের যাতায়াতের একমাত্র সড়ক এটি। এ সড়কের বাইশারী অংশে করলিয়ামুরা, ব্যাঙঢেবা, ঈদগড় অংশে ধুমছাকাটা, হাসনাকাটা, অর্জুন বাগান, পানের ছড়া এবং ঈদগাঁও অংশে ছনখোলা, গজালিয়া, হিমছড়ি ও ভোমরিয়া ঘোনার পাহাড়ি এলাকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সন্ত্রস্ত থাকতে হয় এলাকাবাসীকে। সড়কের এসব অংশে হাটের দিনে ডাকাতি হয় সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া বিভিন্ন সময় অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের মতো ঘটনাও ঘটছে। মুক্তিপণ না দিলে খুন হয়ে যাচ্ছেন অপহৃতরা।

এক দশকে অর্ধডজন খুন, পঙ্গু ২০ : স্থানীয়দের অভিযোগ, ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কে গত এক দশকে পুলিশ সদস্যসহ অর্ধডজন খুন হয়েছেন। পঙ্গু হয়েছেন অন্তত ২০ জন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব ঘটনার কোনো প্রতিকার করতে পারছে না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি জেল থেকে বেরিয়ে আসা চিহ্নিত কয়েকজন সন্ত্রাসী ঈদগড়ের পাহাড়ে আস্তানা গেড়েছে। গহিন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে ডাকাতি ও অপহরণ করছে তারা। ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কের দক্ষিণ পাশের পাহাড় বাইশারী, লেমুছড়ি হয়ে মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে অপরাধীরা ডাকাতি, অপহরণ ও চাঁদাবাজি করে সহজেই পাহাড়ের গহিনে আত্মগোপন করতে পারে।

ঈদগড়ের একজন জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মহেশখালী, ফটিকছড়ি, বাঁশখালীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পালিয়ে আসা দাগি সন্ত্রাসীরাও এই এলাকার স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়েছে। ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। ডাকাতির পাশাপাশি নিরীহ লোকজনকে ধরে পাহাড়ের আস্তানায় আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করছে এরা।

সড়কের ১৫ স্থানে ডাকাতি ও অপহরণ : ঈদগড়ের বাসিন্দা সার্জেন্ট (অব.) আব্দুল হামিদ জানান, ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কে অন্তত ১৫টি স্থানে ডাকাতি ও অপহরণ হয়। সড়কের ঈদগড় অংশে অর্জুন বাগান, পানের ছরা ঢালা এবং ঈদগাঁও অংশে ছনখোলা, হিমছড়ি, ভোমরিয়া ঘোনা ও গজালিয়া ঢালায় অপরাধ হয় বেশি।

ঈদগড় সিএনজি শ্রমিক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম জানান, বছর দুয়েক আগে পুলিশি অভিযানে চিহ্নিত কিছু ডাকাত ও সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হওয়ার পর সড়কে অপরাধ কমে এসেছিল। কিন্তু এখন তারা আবারও জামিনে বেরিয়ে এসে নানা অপরাধ করছে।

ঈদগড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমদ ভুট্টো জানান, এক দশক আগে এ সড়কে ডাকাতের গুলিতে নিহত হন ধুমছাকাটা গ্রামের জাকের হোসেন ও মো. সোলাইমান সিকদার। ডাকাতের গুলিতে আহত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন টুটার বিলের আবুল কাশেম, রেনুরকুলের নূরুল হুদাসহ আরও কয়েকজন।

চেয়ারম্যান ভুট্টো জানান, ঈদগড়-ঈদগাঁও সড়কের পানের ছড়া ঢালা থেকে অপহৃত হন ঈদগড়ের বনি আমিন ও আকবর হোসেন। সাড়ে চার লাখ টাকার বিনিময়ে মুক্তি পান তারা। লম্বাবিল এলাকা থেকে হাফেজ রশিদ উল্লাহ এবং হিমছড়ি ঢালার সাত্তারা ঘোনা এলাকা থেকে সিএনজি চালক সাইফুল ইসলাম, ফরিদুল আলম এবং নূরুল ইসলামও অপহরণ হওয়ার পর ছাড়া পান মুক্তিপণ দিয়ে। 

একইভাবে অপহৃত হয়েছেন বাইশারী লেদুরমুখ থেকে তামাকচাষি ছালেহ আহামদ ও রাজিব; চাইল্যাতলী থেকে মো. শাহজালাল, বাইশারী রাঙ্গাঝিরি থেকে মিজানুর রহমান ও বুলবুল আক্তার; হিমছড়ি ঢালায় দেলোয়ার হোসেন, মনিরুল ইসলাম খোকন ও মো. কালু; দোছড়ি ইউনিয়নের লংগদু থেকে ফরিদুল আলম ও মো. হুমায়ুন কবির; বড়ইচর এলাকা থেকে জালাল উদ্দিন ও আবদুল কাদের; ধুমছাকাটা এলাকা থেকে মাওলানা হাবিবুর রহমান, নূরুল কবির রাশেদ ও ব্যবসায়ী নেজাম উদ্দীন এবং ব্যাঙঢেবা এলাকা থেকে মো. ইউনুছ, মো. করিম ও মো. আবু বক্কর। ঈদগড় যাওয়ার পথে অপহৃত হন নূরুল আমিন ও হেলাল উদ্দিন। 
তাদের সবাই মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। সম্প্রতি দিনদুপুরে অপহৃত হন রাবার বাগান ম্যানেজার আরিফ উল্লাহ। অপহরণের ২৪ ঘণ্টা পর তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ নিয়ে তাকে ছেড়ে দেয় সন্ত্রাসীরা। তিনি বলেন, দীর্ঘ এক দশক ধরে সন্ত্রাসী ও ডাকাতদের সঙ্গে যুদ্ধ করছি। শীর্ষ এক ডাকাত শাহাব উদ্দিন ঈদগড় স্টেশনে গণপিটুনিতে মারা যায়। বিক্ষুব্ধ মানুষজন চিহ্নিত ডাকাতদের বাড়িঘরে হামলা চালায়। অথচ ডাকাত শাহাব উদ্দিন ও মহিউদ্দিন হত্যা মামলায় এক নম্বর আসামি করা হয়েছে আমাকে।

সক্রিয় তিনটি অপরাধী চক্র : অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই সড়কে অপরাধমূলক কাজে সক্রিয় তিনটি গ্রুপ। এসব গ্রুপে রয়েছে করলিয়া মুরা এলাকায় আবদুল করিম, আমির হামজা ও আবদুর রশিদ; বৈদ্যপাড়ার জসীম উদ্দিন, পশ্চিম হাসনাকাটার আইয়ুব আলী, ফরিদ মিয়া, ফারুক মিয়া এবং বাইশারী লম্বাবিলের আবদুর সবুরসহ অন্তত ৩০ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তাদের সঙ্গে রয়েছে বহিরাগত অপরাধীও।

পুলিশও অরক্ষিত :ঈদগড় ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি মনিরুল ইসলাম বলেন, শুধু কণ্ঠশিল্পী জনি রাজই নয়, এই সড়কে আরও অনেক হত্যাই হয়েছে। একবার এক পুলিশ সদস্যও নিহত হয়েছেন ডাকাতের গুলিতে। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের ৯ নভেম্বর এই সড়কে দায়িত্বরত ঈদগড় পুলিশ ফাঁড়ির সদস্য সুষম চাকমা ডাকাতদের গুলিতে নিহত হন। এই হত্যার বিচার এখনও শেষ হয়নি।

চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমদ ভুট্টো বলেন, ঈদগড় পুলিশ ক্যাম্পে মাত্র ১৫ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। কিন্তু প্রায়ই কক্সবাজারে ভিআইপিদের প্রটোকল দেওয়ার জন্য এখানকার ফাঁড়ি থেকেও পুলিশ সদস্যদের মহাসড়কে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন এ সড়কটি অরক্ষিত হয়ে পড়ে।
সন্ত্রাসীদের ধরতে আবারও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করার অনুরোধ জানান ঈদগড় ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বার মনিরুজ্জামান মনির।
এলাকার জনপ্রতিনিধিরা জানান, ঈদগড় পুলিশ ক্যাম্পে জনবল কম। তার ওপর ক্যাম্পে কোনো গাড়ি নেই। ডাকাতি বা অন্য কোনো অপরাধ হলে দ্রুত ঘটনাস্থলে যেতে পারে না পুলিশ। পৌঁছানোর আগেই নিরাপদে পালিয়ে যায় ডাকাতরা। পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই জাফর আলমও জানান, এই জনবল ও যানবাহন সমস্যা নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কষ্টসাধ্য। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় কাজ করতে হয় আমাদের।

রামু থানার অফিসার ইনচার্জ জেএম আজমিরুজ্জামান বলেন, কক্সবাজার জেলায় সব পুলিশ সদস্যই নতুন যোগ দিয়েছেন। ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কে ডাকাতি প্রতিরোধে পুলিশ কাজ করছে। তিনি বলেন, জনি হত্যার তদন্তে একাধিক টিম কাজ করছে। অচিরেই এর ফলাফল পাওয়া যাবে।

কক্সবাজার সদর-রামু আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল বলেন, ভৌগোলিক ও আইনি জটিলতার কারণে ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কটি যে কোনো একটি থানার অধীনে রাখা সম্ভব নয়। তাই দুটি থানার অধীনেই পুলিশি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। তিনি বলেন, ঈদগড়ে একটি সেনাক্যাম্প স্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। তাহলে ঈদগাঁও ও ঈদগড়ে সন্ত্রাস-ডাকাতি-অপহরণ বন্ধ হয়ে যাবে আশা করা যায়।

   এই দিন
এই বিভাগের আরো খবর