শুক্রবার   ০৩ এপ্রিল ২০২০   চৈত্র ১৯ ১৪২৬   ০৮ শা'বান ১৪৪১

Beta Version
সর্বশেষ:
করোনা পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন ৫ এপ্রিল তথ্য গোপন করে এই মহামারী এড়ানো যাবে না: রিজভী বিশ্বজুড়ে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৯ লাখ ছাড়িয়ে, প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৪৮ হাজার করোনা সর্তকতায় আজ থেকে কঠোর অবস্থানে সেনাবাহিনী ঘর থেকে তুলে নিয়ে যুবলীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা ঢাকা ছাড়লেন ৩২৭ জাপানি বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস আজ সাধারণ ছুটিতে ব্যাংকে লেনদেনের সময় বাড়ল করোনায় মৃত ব্যক্তির থেকে ভাইরাস ছড়ায় না: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি উপজেলা থেকে করোনার অন্তত দুজনের নমুনা সংগ্রহের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর দেশে আরও দুজন করোনা রোগী শনাক্ত ,২৪ ঘণ্টায় দেশে মারা যাননি কেউ: এমআইএস
১০৬

‘ওরে মেরে ফেল, সাংবাদিক জীবিত রাখলে সমস্যা’

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

সদ্য শেষ হওয়া সিটি নির্বাচনের দিন রাজধানীর জাফরাবাদে দুর্বৃত্তের হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিক মোস্তাফিজুর রহমান সুমন। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের রামদার কোপে গুরুতর আহত হন তিনি। মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে এই সংবাদকর্মী এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। দীর্ঘদিন অপরাধ বিটে কাজ করে আসা সুমন এর আগেও হামলার শিকার হয়েছেন একাধিকবার। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন বারবার। তবু পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে, বিন্দুমাত্র সরে আসেননি। সেদিনের রোমহর্ষক ঘটনা, দেশে সাংবাদিকতার ঝুঁকি, সংকট নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।

সেদিন কী ঘটেছিল?

অফিসের গাড়িতে করে সকাল ৭টায় বাসা থেকে বের হই। বিভিন্ন এলাকার ভোট কেন্দ্র ঘুরে মোহাম্মদপুর এলাকায় যেতেই খবর পাই ঢাকা উত্তরের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের রায়েরবাজার জাগো ফাউন্ডেশন স্কুল কেন্দ্র এলাকায় সংঘর্ষ হচ্ছে। দ্রুত সেদিকে যাই। গাড়িটি কোনোভাবে সাদেক খান রোড সংলগ্ন গলিতে রেখে নেমে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি সশস্ত্র হামলা চলছে। সঙ্গে থাকা এক সহকর্মীর ক্যামেরা দিয়ে কয়েক ছবি তুলি। পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর দেখে ক্যামেরা রেখে মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছিলাম। পাঁচ-সাত মিনিট পর পুলিশ সদস্যরা এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু তখনও সশস্ত্র মহড়া দিচ্ছিলো সন্ত্রাসীরা। তারা ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী (বর্তমানে নির্বাচিত) শেখ মোহাম্মদ হোসেন খোকনের টিফিন ক্যারিয়ারের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছিলো। হকিস্টিক, রামদা, চাপাতি, ছুরি, রড, লাঠি হাতে মিছিল করতে করতে কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছিলো তারা। সেই দৃশ্য মোবাইলফোনে ধারণ করছিলাম আমি।

হামলাটা হলো কখন?

ঠিক ওই সময়েই হামলাটা হয়। হঠাৎ শ্যামবর্ণের ২০-২২ বছরের এক সশস্ত্র যুবক ক্ষিপ্ত হয়ে এগিয়ে আসে। চিৎকার করে বলে, ‘এই তোর এতো বড় সাহস, ছবি তোললি ক্যান? শালার পো আমাগো চিনিস না। এক্ষুনি কাইট্টা পালামু।’ আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করেনি ওরা। টেনে হিঁচড়ে মিছিলের মধ্যখানে নিয়ে যায়। কিছু বুঝে উঠার আগে গলা বরাবর রামদা দিয়ে কোপ দেয় একজন। তাৎক্ষণিকভাবে সরে যাই। আমার ধারণা ওই কোপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে না পারলে তখনই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হতো আমাকে।
কিন্তু বর্বরোচিত হামলার এখানেই শুরু। কোপ থেকে রক্ষা পেতেই লোহার রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে আরেক সন্ত্রাসী। মুহুর্তের রক্তে ভরে যায় আমার শরীর। আমার রক্ত ছিটে ওদের গায়েও লাগে। তখন আরও কয়েক জন মারধরে অংশ নেয়। আমি নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করছিলাম। আমার গলায় ঝুলানো নির্বাচন কমিশনের ‘সাংবাদিক’ লেখা সম্বলিত পাস কার্ডে অস্ত্র ঠেকিয়ে একজন বলতে থাকে, ‘সাম্বাদিক, তোকে কেটে টুকরো টুকরো করে নদীতে ফেলে দেব। আমরা ভাইয়ের লোক, চিনিস না আমাদের, কোন সাহসে ছবি তুলিস।’ একটু দুর থেকে অভিন্ন আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। ওরে মার, মেরে ফেল। সাংবাদিক জীবীত রাখলে সমস্যা। এরকম বলছিলো একজন। নির্দেশ পেয়ে রামদা নিয়ে কুপাতে যায় আরেক যুবক।

বাঁচলেন কীভাবে?

আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে সহকর্মী আজমি আনোয়ার। সাংবাদিক লেখা সম্বলিত কার্ড আড়ালে রেখে তিনি এগিয়ে আসেন। রামদার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘কি করছেন,  ওকে তো অর্ধেক মেরেই ফেলছেন। আর মারবেন না। ও মারা যাবে।’ হামলাকারী রামদা নিয়ে একটু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রামদার কোপ থামলেও থামছিলো না কিল, ঘুষি আর লাঠি, হকিস্টিকের আঘাত। দেখতে দেখতে ১০-১৫ জন অংশ নেয় মারধরে। আমি তখন মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ে আছি। আজমি আপ্রাণ চেষ্টা করছিল আমাকে বাঁচাতে। আমি শুনতে পাচ্ছিলাম, সে বলছিলো, ‘ওরে আল্লাহ, আল্লাহগো বাঁচাও বাঁচাও, মাগো, বাবাগো, ভাইগো আর মারবেন না..।’ আমি তখন অজ্ঞান হয়ে পড়ি। এরপরেই সম্ভবত আমি মরে গেছি ভেবে ওরা চলে যায়।
আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে আসলেন কারা?

সহকর্মী দুই সাংবাদিক আজমি আনোয়ার ও সালাহ উদ্দিন জসিম এবং স্থানীয় দুই যুবক আমাকে টেনে তোলেন। মাথা থেকে রক্ত বের হচ্ছে, রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করেন তারা। দ্রুত একটি গাড়িতে করে নিয়ে যান পাশের শিকদার মেডিকেলে। পুলিশ কেস বলে চিকিৎসা করতে অনীহা প্রকাশ করেন জরুরি বিভাগের দায়িত্বশীলরা। একপর্যায়ে একজন ডাক্তারের পরামর্শে প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয়। তারপর নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

হামলাকারীদের পরিচয় জানতে পেয়েছেন?

মারের মধ্যেই মানিব্যাগ, অফিসের দেয়া স্যামসং এস ফিফটি মোবাইলফোন কেড়ে নেয় হামলাকারীরা। ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শেখ মোহাম্মদ হোসেন খোকনের নির্দেশেই সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আমাকে প্রাণে মারার উদ্দেশ্যে পিটিয়েছে। সশস্ত্র ছবি, ভিডিও ধারণ করার কারণেই আমাকে হত্যার নির্দেশ দেন শেখ মোহাম্মদ হোসেন খোকন। হামলার পর ঢামেক হাসপাতালে গিয়ে মামলা না করার জন্য হুমকিও দিয়েছেন খোকন।

   এই দিন